• জাতীয়
  • বাংলাদেশের হৃদয়ে ওসমান হাদি: বিদ্রোহী কবির পাশে শায়িত হলেন বিপ্লবী তরুণ

বাংলাদেশের হৃদয়ে ওসমান হাদি: বিদ্রোহী কবির পাশে শায়িত হলেন বিপ্লবী তরুণ

মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজা অনুষ্ঠিত, ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ শীর্ষ নেতাদের অংশগ্রহণ; হত্যাকারীদের বিচার দাবি।

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
বাংলাদেশের হৃদয়ে ওসমান হাদি: বিদ্রোহী কবির পাশে শায়িত হলেন বিপ্লবী তরুণ

অসমাপ্ত মহাকাব্যের তরুণ মহাবীর শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদিকে শেষ বিদায় জানাতে গতকাল শনিবার (২১ ডিসেম্বর ২০২৫) রাজধানী ঢাকায় নেমেছিল জনসমুদ্র। কবি গোলাম মোস্তফার বিখ্যাত পঙক্তিরই যেন জীবন্ত প্রতিচ্ছবি ছিলেন তিনি। লাখো মানুষের অংশগ্রহণে বীরোচিত বিদায় পেলেন এই নেতা। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ ছাড়িয়ে ফার্মগেট, আসাদগেট পর্যন্ত ছড়িয়েছিল শোক ও ভালোবাসার ঢেউ। জানাজা শেষে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে দাফন করা হয়।

বিশাল জানাজায় জনসমুদ্র শহীদ হাদির জানাজায় অংশ নিতে সকাল থেকেই হাজার হাজার মানুষের মিছিল ছিল মানিক মিয়া অ্যাভিনিউমুখী। দুপুর ১টার দিকেই প্রশস্ত ওই সড়ক কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে, যা ফার্মগেটের খামারবাড়ি, আসাদগেট এবং উত্তর দিকে চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অংশগ্রহণকারীদের অনেকের মাথায় জাতীয় পতাকা বাঁধা ছিল বা গায়ে জড়ানো ছিল। তাদের কণ্ঠে ছিল 'আমরা সবাই হাদি হবো, যুগে যুগে লড়ে যাব', 'হাদি ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না' স্লোগান। মানুষের ভিড় দেখে জানাজাকে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বলে মন্তব্য করেন উপস্থিত অনেকে।

নিরাপত্তা ও জানাজার বিবরণ জানাজাকে ঘিরে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশের কড়া নিরাপত্তা ছিল। ডিএমপির ১ হাজার বডি ওর্ন ক্যামেরাসহ পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন ছিলেন। দুপুর আড়াইটায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হাদির জানাজা হয়, যেখানে ইমামতি করেন তার বড় ভাই মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক। জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। জানাজার আগে ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন হাদির সংক্ষিপ্ত জীবনী পাঠ করেন।

হত্যাকারীদের বিচার দাবি জানাজার পর পরিবারের পক্ষে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বক্তব্য দেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "ওসমান হাদিকে ১৬৮ ঘণ্টা আগে গুলি করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত খুনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে?" তিনি মনে করেন, খুনি একজন নয়, একটি সম্পূর্ণ চক্র কাজ করেছে এবং তাদের সবাইকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। তিনি হাদির রক্ত বৃথা যেতে না দিয়ে দেশে 'ইনসাফ কায়েম হবে' বলে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তবে একই সাথে তিনি যেকোনো ধরনের সহিংসতার উসকানিতে সাড়া না দেওয়ার আহ্বান জানান।

প্রধান উপদেষ্টার শোকবার্তা প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার বক্তব্যে বলেন, "ওসমান হাদি, তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসিনি। তুমি আমাদের বুকের মধ্যে আছো। বাংলাদেশ যতদিন টিকে থাকবে, তুমি আমাদের মধ্যে থাকবে।" তিনি আরও বলেন, "আমরা তোমার কাছে ওয়াদা করতে এসেছি, তুমি যা বলে গেছ, সেটা যেন আমরা পূরণ করতে পারি। সেই ওয়াদা পুরুষানুক্রমে বাংলাদেশের সব মানুষ পূরণ করবে।"

জাতীয় কবির পাশে চিরশায়িত জানাজা শেষে বিকেল ৩টার দিকে হাদির মরদেহ দাফনের উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধি চত্বরে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির দাফন সম্পন্ন হয়। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের প্রাঙ্গণ শোকস্তব্ধ জনসমুদ্রে রূপ নেয়। মোনাজাত পরিচালনা করেন তার বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান বলেন, এই কবরস্থান কেবল দাফনস্থল নয়, এটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সর্বোচ্চ সম্মান জানানোর প্রতীক। তিনি জানান, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মদানকারী একাধিক সন্তান এখানে শায়িত আছেন এবং শহীদ হাদিকে দাফনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় তার সন্তানের প্রতি সম্মান জানিয়েছে।

সংক্ষিপ্ত জীবনী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য প্রার্থী ওসমান হাদি গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর বিজয়নগরে প্রকাশ্য দুর্বৃত্তের গুলিতে গুরুতর আহত হন। এক সপ্তাহ ধরে জীবন-মৃত্যুর লড়াই শেষে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে তিনি হার মানেন। ঝালকাঠির নলছিটিতে জন্ম নেওয়া ওসমান হাদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।

Tags: bangladesh politics dhaka university janaza dr muhammad yunus osman hadi dhaka-8 inkilab moncho sharif osman bin hadi national poet kazi nazrul islam martyr