উত্তরের হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে চুয়াডাঙ্গা। ডিসেম্বরের শেষার্ধে এসে সীমান্তঘেঁষা এই জেলায় জেঁকে বসেছে তীব্র শীত। দিনের ও রাতের তাপমাত্রা প্রায় কাছাকাছি চলে আসায় শীতের অনুভূতি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, যা স্থবির করে দিয়েছে স্বাভাবিক জনজীবন। বিশেষ করে ছিন্নমূল ও নিম্নআয়ের মানুষ হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় চরম বিপাকে পড়েছেন। আবহাওয়া দপ্তরের মতে, মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে চুয়াডাঙ্গার তাপমাত্রা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস হ্রাস পেয়েছে।
পারদ নামছে চুয়াডাঙ্গায়: শীতের তীব্রতা কেন বেশি?
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে, রোববার (২১ ডিসেম্বর) সকাল ৬টায় জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১৩ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অথচ আগের দিন শনিবার এই তাপমাত্রা ছিল ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ মাত্র একদিনের ব্যবধানে পারদ নেমেছে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি।
শনিবার সারাদিন সূর্যের দেখা না মেলায় এবং আকাশ কিছুটা মেঘলা থাকায় ভূপৃষ্ঠের উষ্ণতা বাড়তে পারেনি। আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জামিনুর রহমান জানান, উত্তর দিক থেকে আসা হিমেল বাতাস এবং ঘন কুয়াশার কারণে শীতের দাপট বেড়েছে। আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা আরও হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা একটি মৃদু শৈত্যপ্রবাহে (Cold Wave) রূপ নিতে পারে।
স্বাস্থ্যসংকট: রোটা ভাইরাসের প্রকোপ ও শয্যাসংকট
তীব্র ঠান্ডার সমান্তরালে চুয়াডাঙ্গায় দেখা দিয়েছে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে দলে দলে হাসপাতালে ভিড় করছেন। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের চিত্র এখন অত্যন্ত করুণ। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি হওয়ায় ইনপেশেন্ট (Inpatient) ওয়ার্ডগুলোর বারান্দা ও মেঝেতেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
সদর হাসপাতালের শিশু কনসালটেন্ট ডা. মাহবুবুর রহমান মিলন জানান, শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোটা ভাইরাসের (Rotavirus) কারণে শিশুরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। এ ছাড়াও নিউমোনিয়া (Pneumonia) ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও নার্সরা। বর্তমানে হাসপাতালের ডায়রিয়া ও শিশু ওয়ার্ডে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত প্রায় ১৫০ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ, এই প্রতিকূল আবহাওয়ায় শিশুদের পর্যাপ্ত গরম কাপড় পরিধান নিশ্চিত করতে হবে এবং পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
বিপর্যস্ত জনজীবন ও প্রশাসনের ভূমিকা
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুয়াশার দাপটে দিনের বেলাতেও সড়কে যানবাহন চলাচল করছে হেডলাইট জ্বালিয়ে। অতি প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘর থেকে বের হচ্ছে না। শহরের মোড়ে মোড়ে এবং গ্রামীণ জনপদে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুনের উষ্ণতা নেওয়ার চেষ্টা করছেন প্রান্তিক মানুষ।
শীতের প্রকোপ মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, চারটি উপজেলায় এ পর্যন্ত প্রায় ৮ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও ৬ হাজার কম্বল বরাদ্দের অপেক্ষায় রয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শীতার্ত মানুষের সংখ্যার তুলনায় এই সাহায্য অত্যন্ত নগণ্য। রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এই মানবিক সংকটে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সুধী সমাজ।
চুয়াডাঙ্গার এই হাড়কাঁপানো শীত কেবল আবহাওয়াগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর টিকে থাকার লড়াই এবং ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এক রুঢ় বাস্তবতাকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।