ভারতের দক্ষিণী রাজ্য কেরালার পালাক্কাদ জেলায় এক মর্মান্তিক ও চাঞ্চল্যকর গণপিটুনির (Mob Lynching) ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। নিজের দেশেরই একজন শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি নাগরিক’ সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে একদল উত্তেজিত জনতার বিরুদ্ধে। নিহত ওই ব্যক্তি আদতে ভারতের ছত্তিশগড় রাজ্যের শক্তি জেলার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় কর্মরত পরিযায়ী শ্রমিকদের (Migrant Workers) মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
কাজের সন্ধানে গিয়ে সলিল সমাধি
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহতের নাম রামনারায়ণ বাঘেল (৩১)। তিনি ছত্তিশগড়ের কারহি গ্রামের একজন অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান। গত ১৩ ডিসেম্বর উন্নত জীবন ও কাজের আশায় কেরালার পালাক্কাদে এসেছিলেন তিনি। সেখানে একটি নির্মাণাধীন সাইটে দৈনিক মজুরির (Daily Wage) ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের মাথাতেই এক ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হতে হলো তাকে।
পরিচয় বিভ্রাট ও চুরির সন্দেহ
স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, পালাক্কাদ এলাকায় সম্প্রতি একটি চুরির ঘটনা ঘটেছিল। সেই চুরির ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এলাকাবাসীর নজরে আসেন রামনারায়ণ। তবে বিষয়টি কেবল চুরির সন্দেহে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এক পর্যায়ে তাকে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে আক্রমণ শুরু হয়। উত্তেজিত জনতা লাঠিসোঁটা নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। উপুর্যুপরি প্রহারে গুরুতর জগত হন রামনারায়ণ, যার ফলে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
পরিবারের আহাজারি ও অসহায়ত্ব
নিহতের আত্মীয় কিশান বাঘেল সংবাদমাধ্যমকে জানান, রামনারায়ণ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার বাড়িতে ললিতা নামে স্ত্রী এবং আট ও নয় বছর বয়সী দুটি শিশু সন্তান রয়েছে। কিশানের ভাষ্যমতে, গ্রামে কাজ না থাকায় শশীকান্ত বাঘেল নামে এক আত্মীয়ের অনুরোধে কেরালায় পাড়ি জমিয়েছিলেন রামনারায়ণ। গত শুক্রবার তার স্ত্রী ললিতা পালাক্কাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেও আর্থিক টানাপোড়েন ও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে চরম সংকটের মুখে পড়েছেন তিনি।
পুলিশি পদক্ষেপ ও বর্তমান পরিস্থিতি
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর কেরালা পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করেছে। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এরই মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এটি একটি ‘Hate Crime’ বা নিছক ভুল বোঝাবুঝি কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এলাকায় নতুন করে কোনো সাম্প্রদায়িক বা জাতিগত সংঘাত যাতে না ঘটে, সেজন্য নিরাপত্তা জোরদার (Security Measures) করা হয়েছে।
পরিযায়ী শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক
এই ঘটনার জেরে কেরালার বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্পে কাজ করা অন্যান্য ভিনরাজ্যের শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক ভীতি দেখা দিয়েছে। ভারতের এক রাজ্যের নাগরিক অন্য রাজ্যে গিয়ে কেবল ভাষা বা চেহারার ভিন্নতার কারণে ‘বিদেশি’ সন্দেহে নিগৃহীত হওয়ার বিষয়টি দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় এক নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা এই ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন।
ছত্তিশগড়ের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে পেটের তাগিদে কেরালায় যাওয়া রামনারায়ণের এই মৃত্যু আবারও প্রমাণ করল যে, সামাজিক গুজব এবং গণপিটুনির সংস্কৃতি কীভাবে নিরীহ মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কতটা কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে।