• জীবনযাপন
  • স্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক ‘কাঁচা দুধ’: অমৃত না কি বিষ? যা বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা

স্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক ‘কাঁচা দুধ’: অমৃত না কি বিষ? যা বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা

জীবনযাপন ১ মিনিট পড়া
স্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক ‘কাঁচা দুধ’: অমৃত না কি বিষ? যা বলছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা

পুষ্টির আশায় সরাসরি খামার থেকে আনা কাঁচা দুধ পান করছেন? সাবধান! অজান্তেই শরীরে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া ও পক্ষাঘাতের ঝুঁকি ডেকে আনছেন না তো? জেনে নিন পাস্তুরাইজেশনের প্রয়োজনীয়তা।

প্রাকৃতিক উৎস থেকে পাওয়া কোনো কিছুই সাধারণত অস্বাস্থ্যকর হয় না—এমন একটি ধারণা আমাদের সমাজে প্রচলিত। আর এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই অনেকে মনে করেন, সরাসরি গাভী বা ছাগলের বাঁট থেকে সংগ্রহ করা ‘কাঁচা দুধ’ (Raw Milk) পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং খাঁটি। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই অভ্যাসের বিরুদ্ধে চরম সতর্কতা জারি করেছেন। তাদের মতে, অপাস্তুরিত বা কাঁচা দুধ কেবল অস্বাস্থ্যকরই নয়, বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী সংক্রমণের কারণ হতে পারে।

ব্যাকটেরিয়া ও ইনফেকশনের আখড়া

দুধ যখন পশুর শরীর থেকে সংগ্রহ করা হয়, তখন এতে সালমোনেলা (Salmonella), ই. কোলাই (E. coli) এবং ক্যাম্পাইলোব্যাক্টরের (Campylobacter) মতো ভয়ংকর প্যাথোজেন বা ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া মিশে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। এগুলো মারাত্মক ‘Food Poisoning’ বা খাদ্য বিষক্রিয়ার প্রধান কারণ। কাঁচা দুধ পানের ফলে বমি, তীব্র ডায়রিয়া, পেটে অসহ্য ব্যথা এবং জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সাধারণ এই অসুস্থতাগুলো শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে দ্রুত ‘Dehydration’ বা পানিশূন্যতা তৈরি করে পরিস্থিতি জটিল করে তোলে।

গর্ভবতী নারীদের জন্য ‘লিস্টিরিওসিস’ ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঁচা দুধে বিদ্যমান ‘লিস্টেরিয়া’ নামক ব্যাকটেরিয়া গর্ভবতী নারীদের জন্য সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক। এই ব্যাকটেরিয়া থেকে যে সংক্রমণ হয়, তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘Listeriosis’ বলা হয়। এর ফলে অকাল প্রসব (Premature Birth), গর্ভপাত (Miscarriage), এমনকি নবজাতকের মৃত্যুর মতো হূদয়বিদারক ঘটনা ঘটতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় কোনোভাবেই অপাস্তুরিত দুধ বা তা দিয়ে তৈরি পনির খাওয়া উচিত নয়।

পক্ষাঘাত ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য জটিলতা

কাঁচা দুধ পানের ঝুঁকি কেবল সাময়িক পেটের পীড়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে তৈরি হওয়া ‘Campylobacter’ সংক্রমণ থেকে ‘Guillain-Barré Syndrome’ (GBS)-এর মতো বিরল ও ভয়ংকর স্নায়বিক রোগ হতে পারে। এটি এমন একটি শারীরিক অবস্থা যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ‘Immune System’ ভুলবশত নিজের স্নায়ুকেই আক্রমণ করে বসে। এর পরিণতিতে শরীর আংশিক বা সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত (Paralysis) হতে পারে, যার জন্য প্রয়োজন হয় দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা।

দুর্বল ইমিউন সিস্টেমের ওপর প্রাণঘাতী প্রভাব

যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘Immune System’ জন্মগতভাবে দুর্বল কিংবা যারা ক্যান্সার, এইচআইভি/এইডস বা অঙ্গ প্রতিস্থাপনের (Organ Transplant) মতো জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের জন্য কাঁচা দুধ পানের ঝুঁকি সাধারণের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। সামান্য পরিমাণ জীবাণুও তাদের শরীরে বড় ধরনের সংক্রমণ তৈরি করে দ্রুত মৃত্যু ডেকে আনতে পারে।

পাস্তুরাইজেশন কেন অপরিহার্য? জীবন বাঁচাতে বিজ্ঞানের সুরক্ষা

উনবিংশ শতাব্দীতে ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ‘Pasteurization’ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এটি এমন একটি প্রক্রিয়া যেখানে দুধকে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রায় ফুটিয়ে দ্রুত ঠাণ্ডা করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় দুধের স্বাদে বা মূল পুষ্টিগুণে তেমন কোনো পরিবর্তন না হলেও, এতে থাকা ক্ষতিকর ৯৯.৯ শতাংশ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হয়ে যায়।

অনেকে মনে করেন কাঁচা দুধে ‘এনজাইম’ বেশি থাকে, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন সেই তথাকথিত এনজাইম মানবদেহে হজমে কোনো বিশেষ ভূমিকা রাখে না। বরং পাস্তুরাইজেশনের মাধ্যমে দুধকে নিরাপদ করাই হচ্ছে বুদ্ধিমানের কাজ। সুতরাং, পরিবারের সুস্থতায় সর্বদা প্যাকেটজাত পাস্তুরিত দুধ অথবা বাড়িতে ভালোভাবে ফুটিয়ে নেওয়া দুধ পান করা নিশ্চিত করুন। মনে রাখবেন, সামান্য অসতর্কতা আপনার ও আপনার প্রিয়জনের জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Tags: raw milk food poisoning bacteria infection child health immune system health risks pasteurization listeriosis medical tips nutrition science