মেদহীন ছিপছিপে শরীর গড়তে যারা ডায়েট করেন, তাদের খাদ্যতালিকার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো শসা। ক্যালরি কম এবং জলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় ওজন কমাতে এর জুড়ি মেলা ভার। বিশেষ করে গ্রীষ্মপ্রধান দেশে শরীর শীতল রাখতে শসার বিকল্প ভাবা কঠিন। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। সাম্প্রতিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, ওজন কমানোর নেশায় অতিরিক্ত শসা খাওয়ার অভ্যাস শরীরে বয়ে আনতে পারে দীর্ঘমেয়াদী জটিলতা। ত্বকের অ্যালার্জি থেকে শুরু করে সাইনোসাইটিস কিংবা হৃদযন্ত্রের সমস্যা—শসার অতিসেবন বিষের মতো কাজ করতে পারে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক অতিরিক্ত শসা খাওয়ার ৯টি ক্ষতিকর দিক যা আপনার অজান্তেই স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাচ্ছে:
১. ডিহাইড্রেশন ও ইলেক্ট্রোলাইটের ভারসাম্যহীনতা
শসার বীজে থাকে ‘কিউকারবিটিন’ (Cucurbitin) নামক এক বিশেষ উপাদান। এটি প্রাকৃতিকভাবে মূত্রবর্ধক বা ডাইউরেটিক (Diuretic) হিসেবে কাজ করে। সীমিত পরিমাণে এটি শরীরের বিষাক্ত টক্সিন বের করতে সাহায্য করলেও, অতিরিক্ত শসা খেলে শরীর থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জল বেরিয়ে যেতে পারে। এর ফলে জলশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন (Dehydration) তৈরি হয় এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ ইলেক্ট্রোলাইট স্তরের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়।
২. শরীরে বিষাক্ত উপাদানের প্রবেশ
শসার তেতো অংশে থাকে ‘কিউকারবিটাসিন’ (Cucurbitacin) এবং ‘টেট্রাসাইক্লিক ট্রাইটারপেনয়েড’ (Tetracyclic Triterpenoids)। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই উপাদানগুলো মূলত শসাকে বিষাক্ত বা তিক্ত করে তোলে। পরিমিত মাত্রার বাইরে এই উপাদানগুলো শরীরে প্রবেশ করলে তা জীবনহানিকর সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
৩. ভিটামিন সি-এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া
আমরা জানি ভিটামিন সি (Vitamin C) একটি শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তবে অতিরিক্ত শসা খাওয়ার ফলে শরীরে ভিটামিন সি-এর পরিমাণ যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন এটি ‘প্রো-অক্সিডেন্ট’ (Pro-oxidant) হিসেবে কাজ শুরু করে। ফলে শরীরে ক্ষতিকর ‘ফ্রি র্যাডিকেল’ বৃদ্ধি পায় যা অকাল বার্ধক্য, ব্রণ এবং এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৪. হাইপারক্যালেমিয়া ও কিডনির ঝুঁকি
শসায় প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম (Potassium) থাকে। শরীরে পটাশিয়ামের মাত্রা অত্যধিক বেড়ে গেলে তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘হাইপারক্যালেমিয়া’ (Hyperkalemia) বলা হয়। এর প্রাথমিক লক্ষণ হলো পেটে ব্যথা, গ্যাস ও অস্বস্তি। দীর্ঘমেয়াদে এটি রেনাল সিস্টেম (Renal System) বা কিডনির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
৫. ওরাল ও স্কিন অ্যালার্জি
আমেরিকান একাডেমি অব অ্যালার্জি অ্যাজমা অ্যান্ড ইমিউনোলজি’র গবেষণা অনুসারে, যারা কাঁচা সবজিতে সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে কাঁচা শসা খেলে মুখে ও ত্বকে অ্যালার্জি (Allergy) হতে পারে। ঠোঁট ফোলা বা গলা চুলকানির মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তবে রান্না করা শসার ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি কম থাকে।
৬. হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ
শসার প্রায় ৯০ শতাংশই জল। অতিরিক্ত শসা খেলে রক্তনালীতে জলের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা পরোক্ষভাবে রক্তের আয়তন (Blood Volume) বৃদ্ধি করে। এর ফলে রক্তনালী ও হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। এর ফলে ঘন ঘন মাথাব্যথা এবং শ্বাসকষ্টের মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে।
৭. দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস্ট্রিক ও পেট ফাঁপা
শসায় থাকা কিউকারবিটাসিন অনেকের ক্ষেত্রে বদহজমের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে পেট ফুলে যাওয়া বা পেট ফাঁপার মতো সমস্যা দেখা দেয়। যাদের বাঁধাকপি বা ব্রকোলি খেলে পেটে অস্বস্তি হয়, তাদের জন্য শসা খাওয়া সীমিত রাখা বাঞ্ছনীয়।
৮. সাইনোসাইটিসের তীব্রতা বৃদ্ধি
আয়ুর্বেদ ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান উভয়ই মনে করে, শসার শীতল প্রভাব বা ‘কুলিং এফেক্ট’ যাদের দীর্ঘস্থায়ী সাইনোসাইটিস (Sinusitis) বা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত শসা খেলে বুকে কফ জমা বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
৯. গর্ভাবস্থায় বিশেষ সতর্কতা
গর্ভাবস্থায় শসা সাধারণত নিরাপদ হলেও অতিরিক্ত জলীয় উপাদানের কারণে বারবার প্রস্রাবের বেগ হতে পারে, যা গর্ভবতী নারীদের জন্য অস্বস্তিকর। এছাড়া শসা থেকে হওয়া পেট ফাঁপা বা বদহজম গর্ভাবস্থায় বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী, স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস জরুরি। ওজন কমানোর তাগিদে কেবল শসার ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পরিমিত সুষম খাবার গ্রহণ করা উচিত। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে দেরি না করে একজন ডায়েটিশিয়ান বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।