মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ফের চরমে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর চলমান সামরিক মহড়াকে ঘিরে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজছে। ইসরাইলের প্রবল আশঙ্কা, এই মহড়ার আড়ালে আসলে তেল আবিবকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ছক কষছে তেহরান। সম্ভাব্য এই বিপর্যয় এড়াতে এবং নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখতে তড়িঘড়ি করে মার্কিন প্রশাসনের শরণাপন্ন হয়েছে নেতানিয়াহু সরকার।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’-এর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে ইসরাইলি ও মার্কিন সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে, ইসরাইল ইতোমধ্যেই মার্কিন ডরকে সতর্ক করে জানিয়েছে যে, ইরান তাদের সাম্প্রতিক ‘Military Drill’ বা সামরিক মহড়াকে একটি শক্তিশালী কভার হিসেবে ব্যবহার করে বড় কোনো ‘Surprise Attack’ চালাতে পারে।
ঝুঁকি নিতে নারাজ ইসরাইল
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরে হামাসের সেই নজিরবিহীন হামলার পর ইসরাইলের ‘Risk Appetite’ বা ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ছয় সপ্তাহ আগেও তেহরানের একই ধরনের তৎপরতা দেখে সতর্কবার্তা দিয়েছিল ইসরাইল, যদিও শেষ পর্যন্ত কোনো হামলা হয়নি। তবে এবার ইসরাইলি গোয়েন্দাদের দাবি, হামলার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশের কম হলেও তারা একে কেবল একটি সাধারণ মহড়া হিসেবে ধরে নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে রাজি নয়।
তেহরানের হাতে এখনো ১,৫০০ ক্ষেপণাস্ত্র
সামরিক শক্তির ভারসাম্যের বিচারে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছে। গত জুন মাসের প্রছন্ন যুদ্ধে ইরান তাদের মোট ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের প্রায় ৫০ শতাংশ হারিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে বর্তমানেও তেহরানের সংগ্রহে আনুমানিক ১,৫০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২০০টি ‘Mobile Launcher’ রয়েছে। যদিও তেহরান বর্তমানে তাদের উৎপাদন ক্ষমতা বা ‘Production Capacity’ বাড়িয়ে মজুত পুনরায় পূর্ণ করার চেষ্টা করছে। ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা শাখা এবং মোসাদ মনে করছে, ইরান তাদের ‘Missile Arsenal’ পুনর্গঠন করছে, যা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য এক গুরুতর ‘Security Concern’ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ভুল হিসাব ও ‘Miscalculation’-এর ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে ‘Miscalculation’ বা ভুল হিসাব থেকে। যেখানে এক পক্ষ অপর পক্ষের মহড়াকে হামলার প্রস্তুতি মনে করে ‘Pre-emptive Action’ বা আগাম কোনো পদক্ষেপ নিয়ে ফেলতে পারে। যদিও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (US Intelligence) এখনো আসন্ন হামলার কোনো অকাট্য প্রমাণ পায়নি, তবুও ইসরাইলি বাহিনীর স্নায়ুর চাপ কমছে না।
সেন্টকমের সঙ্গে সামরিক সমন্বয়
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইসরাইল ডিফেন্স ফোর্সেস (IDF) এবং আমেরিকার সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM)-এর মধ্যে এক নিবিড় কৌশলগত সমন্বয় বা ‘Strategic Coordination’ শুরু হয়েছে। আইডিএফ প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির সম্প্রতি সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাডলি কুপারের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করেছেন। এর পর রোববার তাঁরা তেল আবিবে সশরীরে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির পাশাপাশি ‘Joint Intelligence’ শেয়ারিং এবং সমন্বিত সামরিক কৌশলের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ইসরাইল ও আমেরিকার এই নজিরবিহীন প্রতিরক্ষা তৎপরতা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ইরানের প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপ এখন পশ্চিমের নজরে। তেহরানের এই সামরিক মহড়া কেবলই শক্তি প্রদর্শন, নাকি কোনো বড় সংঘাতের পূর্বাভাস—সেই প্রশ্নই এখন বিশ্ব কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে।