দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার সীমান্ত পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চলমান শান্তি আলোচনার তোয়াক্কা না করেই সোমবার (২২ ডিসেম্বর) ভোরে সীমান্ত এলাকায় নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে দুই দেশের সেনাবাহিনী। গোলার লড়াই ছাড়িয়ে এবার আকাশপথে ‘Airstrike’ বা বিমান হামলার অভিযোগ ওঠায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
শান্তি আলোচনার মাঝেই বিমান হামলার অভিযোগ
চলমান যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) উপেক্ষা করে সোমবার ভোর থেকেই থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়া সীমান্ত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, সীমান্তবর্তী বানতেয় মিয়ানচে (Banteay Meanchey) প্রদেশে থাই বিমানবাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে। তাদের অভিযোগ, থাইল্যান্ডের এফ-১৬ (F-16) যুদ্ধবিমান থেকে কম্বোডিয়ার ভূখণ্ড লক্ষ্য করে চারটি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে। কম্বোডিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, তাদের সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে ভূখণ্ড রক্ষায় ‘Combat Ready’ মোডে রয়েছে।
মানবিক বিপর্যয়: বাস্তুচ্যুত ৯ লক্ষাধিক সাধারণ মানুষ
সীমান্তের এই যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে, বোমাবর্ষণের প্রচণ্ড শব্দে আতঙ্কিত মায়েরা তাদের শিশুদের নিয়ে ভূগর্ভস্থ বা নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছেন। কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন মানেত-এর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, সীমান্তের তাদের অংশে প্রায় ৫ লাখ ২৫ হাজার মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে বাস্তুচ্যুত (Displaced) হয়েছেন। অন্যদিকে, থাইল্যান্ড দাবি করেছে তাদের ভূখণ্ডেও প্রায় ৪ লাখ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দুই দেশ মিলিয়ে এই মুহূর্তে প্রায় ৯ লাখের বেশি মানুষ এক ভয়াবহ মানবিক সংকটের মুখে।
দাবি ও পাল্টা দাবির লড়াই
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর দাবি, তার দেশ কখনোই আগে কোনো আগ্রাসনে জড়ায়নি। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, কম্বোডিয়ান বাহিনীর দখলে থাকা থাইল্যান্ডের অধিকাংশ এলাকা ইতোমধ্যে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে কম্বোডিয়া একে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখছে। এই ‘Territorial Dispute’ বা ভূখণ্ডগত বিরোধ এখন দুই দেশের জাতীয় মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
কূটনৈতিক তৎপরতা ও আসিয়ানের ভূমিকা
উত্তপ্ত এই পরিস্থিতিতে আলোচনার টেবিলে ফেরার চেষ্টা করছে আঞ্চলিক জোট আসিয়ান (ASEAN)। মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে মালয়েশীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ হাসানের সভাপতিত্বে একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি বসবেন। জানা গেছে, বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অত্যাধুনিক স্যাটেলাইট তথ্য (Satellite Data) ও মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হবে, যাতে বোঝা যায় কোন পক্ষ আগে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া
যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে উভয় পক্ষকে ভারী অস্ত্রশস্ত্র প্রত্যাহার এবং সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র আলাদাভাবে ‘Diplomatic Channels’ ব্যবহার করে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চালালেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো দৃশ্যমান প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।