বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝেই চীনের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের দ্রুত সম্প্রসারণ নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে পেন্টাগন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দফতরের এক খসড়া প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, চীন তাদের তিনটি কৌশলগত ‘সাইলো ফিল্ডে’ (Silo Field) ১০০টিরও বেশি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বা আইসিবিএম (ICBM) মোতায়েন করেছে। পেন্টাগনের মতে, বিশ্বের অন্য যেকোনো পারমাণবিক শক্তিধর দেশের তুলনায় চীন বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে তার অস্ত্রভাণ্ডার আধুনিকায়ন করছে।
তিনটি সাইলো ফিল্ড ও ডিএফ-৩১ মিসাইল
পেন্টাগনের প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, মঙ্গোলিয়া সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত তিনটি বিশালাকার সাইলো ফিল্ডে চীন তাদের সলিড-ফুয়েল চালিত ‘ডিএফ-৩১’ (DF-31) মডেলের ১০০টিরও বেশি আইসিবিএম মোতায়েন করেছে। সাধারণত ‘সাইলো’ হলো ভূগর্ভস্থ এমন এক বিশাল কাঠামো বা ট্যাঙ্ক, যেখানে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয় এবং যেকোনো সময় উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত রাখা যায়। পেন্টাগন এর আগে এসব সাইলো ফিল্ডের অস্তিত্বের কথা জানালেও, সেখানে কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন রয়েছে সে বিষয়ে এবারই প্রথম নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রকাশ করল।
দ্রুতগতিতে বাড়ছে ওয়ারহেড সংখ্যা
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত চীনের পারমাণবিক ওয়ারহেডের (Nuclear Warhead) সংখ্যা ছিল প্রায় ৬০০-এর কিছু বেশি। যদিও উৎপাদনের গতি আগের তুলনায় সামান্য কম বলে মনে হচ্ছে, তবুও চীনের এই পারমাণবিক সম্প্রসারণ বা ‘Nuclear Expansion’ অব্যাহত রয়েছে। পেন্টাগনের আশঙ্কা, বর্তমান গতি বজায় থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে চীনের হাতে এক হাজারের বেশি ওয়ারহেড থাকতে পারে, যা বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে সক্ষম।
নিরস্ত্রীকরণ প্রস্তাবে অনাগ্রহ ও তাইওয়ান ইস্যু
যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে নিরস্ত্রীকরণ (Disarmament) বিষয়ে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করলেও, বেইজিং এ ব্যাপারে তেমন কোনো সদিচ্ছা দেখাচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পেন্টাগন বলছে, বেইজিং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বা কোনো ধরনের বিস্তৃত নিরাপত্তা আলোচনায় আগ্রহী নয়। এছাড়া তাইওয়ান ইস্যু নিয়েও প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, চীন ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যেকোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়ার মতো সামরিক সক্ষমতা (Military Capability) অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
চীনের প্রতিবাদ ও ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ নীতি পেন্টাগনের এই প্রতিবেদনকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বেইজিং একে ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইচ্ছাকৃতভাবে চীনকে কলঙ্কিত করতে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে। বেইজিং বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তারা আত্মরক্ষামূলক পারমাণবিক কৌশল অনুসরণ করে এবং তাদের সামরিক নীতিতে ‘নো ফার্স্ট ইউজ’ (No First Use) বা আগে আক্রমণ না করার কঠোর প্রতিশ্রুতি বজায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এই দ্রুত সামরিক উত্থান এবং ‘Tech-driven’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এশীয় অঞ্চলে সামরিক প্রতিযোগিতাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। পেন্টাগনের এই খসড়া প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যকার কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।