সুস্থ থাকার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম অপরিহার্য—এটি আমরা সবাই জানি। কিন্তু 'পর্যাপ্ত' শব্দের আড়ালে আমরা কি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঘুমিয়ে ফেলছি? সাম্প্রতিক বিভিন্ন চিকিৎসা গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত ঘুম শরীরের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ৯ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ঘুমান, তাদের শরীরে বাসা বাঁধছে নানা জটিল রোগ। বিশ্রাম যখন বিষাদে পরিণত হয়, তখন জীবনযাত্রায় ভারসাম্য আনা জরুরি হয়ে পড়ে।
মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ও বিষণ্ণতার ঝুঁকি
অনেকেই মনে করেন দীর্ঘক্ষণ ঘুমালে মন সতেজ থাকে। কিন্তু গবেষণার ফলাফল বলছে ঠিক উল্টো কথা। যারা দৈনিক ৯ ঘণ্টার বেশি সময় বিছানায় কাটান, তাদের মধ্যে মানসিক অবসাদ বা ‘Depression’-এর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। অতিরিক্ত ঘুম মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারগুলোর ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে, ফলে সৃজনশীল কাজের প্রতি আগ্রহ কমে যায় এবং এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্ণতা গ্রাস করে। মন ভালো রাখতে চাইলে ঘুমের পরিমাণ কমিয়ে বরং সৃজনশীল কাজে মনোনিবেশ করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বা ‘Brain Function’ হ্রাস
বর্তমানে ঘরে বসে অফিসের কাজ বা 'Work from Home' সংস্কৃতিতে অনেকেরই ঘুমের সময় এলোমেলো হয়ে গেছে। অতিরিক্ত ঘুম মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বা ‘Brain Function’ কমিয়ে দেয়। দীর্ঘক্ষণ ঘুমিয়ে থাকার ফলে মস্তিষ্ক স্থবির হয়ে পড়ে, যার প্রভাব পড়ে সরাসরি কর্মক্ষেত্রে। আপনি যদি দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বা ঠান্ডা মাথায় জটিল কাজ সম্পন্ন করতে চান, তবে ঘুমের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরি। অন্যথায় মস্তিষ্কের তীক্ষ্ণতা ধীরে ধীরে ভোঁতা হয়ে যেতে পারে।
রক্তে গ্লুকোজের ভারসাম্য ও টাইপ ২ ডায়াবেটিস
কানাডার কুইবেক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক তথ্য। সেখানে বলা হয়েছে, রাতে নিয়মিত আট ঘণ্টার বেশি ঘুমালে দেহের রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নষ্ট হতে শুরু করে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ইনসুলিনের ওপর, যা শেষ পর্যন্ত ‘Type 2 Diabetes’-এর ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইলে বিছানায় অলস সময় কাটানোর অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে।
হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ
সুস্থ বেঁচে থাকার জন্য হৃদযন্ত্র বা হার্ট ভালো রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় দেখা গেছে, যারা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঘুমান, তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। মাত্রাতিরিক্ত ঘুমের ফলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া মন্থর হয়ে যেতে পারে, যা হৃদযন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিজের হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে আট ঘণ্টার বেশি ঘুম এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
স্থূলতা বা ‘Obesity’ ও ওজন বৃদ্ধি
অতিরিক্ত ঘুমের সাথে শরীরের ওজনের এক গভীর যোগসূত্র রয়েছে। দীর্ঘক্ষণ ঘুমিয়ে থাকার ফলে শরীরের ক্যালরি বার্ন হওয়ার সুযোগ পায় না এবং মেটাবলিজম রেট কমে যায়। এর ফলে দ্রুত ওজন বাড়তে থাকে, যা পরবর্তীতে স্থূলতা বা ‘Obesity’-তে রূপ নেয়। নিয়মিত ব্যায়াম এবং সঠিক সময়ের ঘুম ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে জাদুর মতো কাজ করে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য ৭ থেকে ৮ ঘণ্টার ঘুমই আদর্শ। এর চেয়ে বেশি ঘুম কেবল আপনার অলসতাই বাড়াবে না, বরং শরীরকে করে তুলবে রোগাক্রান্ত। তাই দীর্ঘায়ু ও সুস্থ জীবন পেতে পরিমিত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।