গাজায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফেরার যে ক্ষীণ আশা দেখা দিয়েছিল, তা আবারও ফিকে হতে শুরু করেছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কঠোর হুঁশিয়ারি এবং যুদ্ধের ময়দানে নতুন করে শুরু হওয়া সঙ্ঘাতের ফলে গাজাজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। তথাকথিত যুদ্ধবিরতি বা Ceasefire লঙ্ঘন করে বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) গাজার বিভিন্ন প্রান্তে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর (IDF) হামলায় অন্তত একজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক শিশুসহ ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
রক্তাক্ত জাবালিয়া ও অবরুদ্ধ উপত্যকার চিত্র
স্থানীয় সূত্র ও সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তর গাজার জাবালিয়া এলাকায় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ইসরাইলি বাহিনী সরাসরি গুলি চালালে আইয়ুব আবদেল আয়েশ নাসর নামে এক ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান। এ সময় আহত হন আরও দুইজন। দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস এবং রাফাহ এলাকাতেও আগ্রাসন থেমে থাকেনি। ওয়াফা সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, খান ইউনিসে ইসরাইলি স্নাইপারের গুলিতে তিনজন আহত হয়েছেন। সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে গাজার মধ্যাঞ্চলীয় মাগাজি শরণার্থী শিবিরে, যেখানে ইসরাইলি বাহিনীর নির্বিচার হামলায় একটি শিশু গুলিবিদ্ধ হয়েছে। গাজা কর্তৃপক্ষের দাবি, ইয়েলো লাইন (Yellow Line) এবং যে সব এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করার কথা ছিল, সেখানেই পরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে।
যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের পরিসংখ্যান ও মানবিক বিপর্যয়
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সরকারি মিডিয়া অফিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী অন্তত ৮৭৫ বার এই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। এই সময়ের মধ্যে ৪ শতাধিক ফিলিস্তিনি ইসরাইলি বাহিনীর হাতে প্রাণ হারিয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতি থাকলেও উপত্যকাজুড়ে এক ধরণের 'অঘোষিত যুদ্ধ' চালিয়ে যাচ্ছে দখলদার বাহিনী। মানবিক সহায়তা বা Humanitarian Aid পৌঁছানোর ক্ষেত্রেও তৈরি করা হচ্ছে চরম প্রতিবন্ধকতা।
নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারি ও হামাসের অবস্থান
এদিকে, রাফাহ এলাকায় একটি বিস্ফোরণে এক ইসরাইলি কর্মকর্তা আহত হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তপ্ত হয়েছে পরিস্থিতি। এই ঘটনার জন্য সরাসরি হামাসকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি অভিযোগ করেছেন, হামাস নিরস্ত্রীকরণের কোনো সদিচ্ছা দেখাচ্ছে না। তবে হামাস এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, ইসরাইলি কর্মকর্তা আহত হওয়ার ঘটনাটি মূলত পুরনো একটি অবিস্ফোরিত বোমা (Unexploded Bomb) থেকে ঘটেছে। হামাস দাবি করেছে, তারা এখনও যুদ্ধবিরতির শর্তাবলীতে অঙ্গীকারবদ্ধ, তবে ইসরাইলি উসকানি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
তুরস্কের কঠোর প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক তৎপরতা
গাজা ইস্যুতে ইসরাইলের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে গাজায় জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা আটকে দিয়ে সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আঙ্কারায় এক বক্তব্যে এরদোয়ান বলেন, "তুরস্ক শান্তির পক্ষে, কিন্তু কোনো প্রকার অন্যায়ের সাথে আমরা আপস করব না।"
একই দিন আঙ্কারায় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে হামাসের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বৈঠক করেছে। বৈঠকে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়ন, জিম্মি মুক্তি এবং উপত্যকায় পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। গাজার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপে এই সহিংসতা বন্ধ হবে এবং একটি টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।