বড়দিনের আনন্দ আর উৎসবের আবহে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবহে বড়সড় আঘাত হানল ভারতের একাধিক রাজ্যের উগ্রপন্থী গোষ্ঠী। যিশুখ্রিস্টের জন্মদিন উদযাপনের প্রস্তুতি চলাকালীন বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থলে অতর্কিত হামলা, ভাঙচুর এবং শপিংমলের ভেতর তাণ্ডব চালানোর খবর পাওয়া গেছে। এমনকি শিশুদের প্রিয় ‘সান্তা ক্লজ’-এর মূর্তিও রেহাই পায়নি উগ্রবাদীদের হাত থেকে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে দেশটির সামাজিক মাধ্যমে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে চারজনকে আটক করেছে পুলিশ।
দেশজুড়ে তাণ্ডব: আসাম থেকে কেরালা আক্রান্ত একাধিক উৎসবস্থল
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম 'দ্য হিন্দু' (The Hindu)-সহ একাধিক প্রথম সারির গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার বড়দিনের উদযাপন চলাকালীন আসাম, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ ও কেরালায় নজিরবিহীন হামলার ঘটনা ঘটে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোতে (Viral Video) দেখা যায়, উন্মত্ত একদল যুবক উগ্র স্লোগান দিতে দিতে উৎসবের আলোকসজ্জা ছিঁড়ে ফেলছে এবং সুসজ্জিত মঞ্চ গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয় যখন উত্তেজিত জনতা বা ‘মব’ (Mob) স্থানীয় শপিংমলগুলোতে ঢুকে পড়ে। সাধারণ ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতেই সেখানে বড়দিনের সাজসজ্জা ভাঙচুর করা হয়। সান্তা ক্লজের কুশপুত্তলিকা দাহ এবং মূর্তি ভাঙার দৃশ্যগুলো নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
কাঠগড়ায় কট্টরপন্থী সংগঠন: নেপথ্যে কারা?
হামলার শিকার হওয়া ব্যক্তি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, এই পরিকল্পিত নাশকতার পেছনে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP), বজরং দল এবং আরএসএস (RSS)-এর মতো গোষ্ঠীগুলোর সরাসরি ইন্ধন রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, জোরপূর্বক ধর্ম পরিবর্তন বা ধর্মীয় আগ্রাসনের অজুহাত তুলে তারা উৎসব পালনে বাধা দিচ্ছে এবং সাধারণ খ্রিস্টান ধর্মানুসারীদের হেনস্তা করছে।
বেশ কিছু জায়গায় গির্জা এবং প্রার্থনা সভায় ঢুকে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষদের ধর্মীয় আচার পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বিভিন্ন এলাকায় টহল জোরদার করেছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করার কাজ শুরু করেছে।
আইনি ব্যবস্থা ও পুলিশের তৎপরতা
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে দেশটির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। এরই মধ্যে উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ভাঙচুরে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪ জন সন্দেহভাজনকে আটক করা হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, কোনো ধরনের উসকানিমূলক কাজ বা ধর্মীয় উগ্রবাদ বরদাস্ত করা হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে বেশ কিছু স্পর্শকাতর এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়েছে।
বৈশ্বিক ভাবমূর্তি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে উদ্বেগ
ভারতের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশে উৎসবের দিনে এ ধরনের হামলা দেশটির বৈশ্বিক ভাবমূর্তিকে সংকটে ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সামাজিক মাধ্যমে মানবাধিকার কর্মী ও সাধারণ মানুষ একে ‘ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা’ (Religious Intolerance) হিসেবে অভিহিত করেছেন। উৎসবের আমেজকে পুঁজি করে কেন বারবার এই উগ্রপন্থী দলগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক।
বড়দিনের এই উৎসব যেখানে ভ্রাতৃত্ব ও শান্তির বার্তা নিয়ে আসে, সেখানে রাজনৈতিক বা আদর্শিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সাধারণ মানুষের ওপর হামলা ভারতের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যের ওপর চপেটাঘাত বলেই মনে করছেন সচেতন সমাজ।