• দেশজুড়ে
  • বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবিতে সলিল সমাধি: নিখোঁজ বাবা-ছেলের নিথর দেহ উদ্ধার, উপকূল জুড়ে শোকের ছায়া

বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবিতে সলিল সমাধি: নিখোঁজ বাবা-ছেলের নিথর দেহ উদ্ধার, উপকূল জুড়ে শোকের ছায়া

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
বঙ্গোপসাগরে ট্রলারডুবিতে সলিল সমাধি: নিখোঁজ বাবা-ছেলের নিথর দেহ উদ্ধার, উপকূল জুড়ে শোকের ছায়া

উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ ও ঝোড়ো হাওয়ায় ত তলিয়ে যায় মাছধরা ট্রলার; ৫ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে বেঁচে ফিরলেন ৪ জেলে, শেষরক্ষা হলো না শামীম ও শিশু সিয়ামের।

বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি এবার কেড়ে নিল দুই মৎস্যজীবীর প্রাণ, যারা সম্পর্কে ছিলেন বাবা ও ছেলে। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার উপকূলীয় জনপদে এখন শুধুই মাতম। গত বুধবার মাঝরাতে গভীর সমুদ্রে ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ হওয়া শামীম (৩৫) এবং তাঁর ১১ বছর বয়সী ছেলে সিয়ামের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা ‘Search and Rescue’ অপারেশনের পর বাবা ও ছেলের মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের স্বপ্ন সলিল সমাধিতে পরিণত হলো।

দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপট: মাঝরাতের সেই বিভীষিকা

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও বেঁচে ফেরা জেলেদের ভাষ্যমতে, গত ২১ ডিসেম্বর (রবিবার) সকালে রাঙ্গাবালীর বড়বাইশদিয়া ইউনিয়নের চরগঙ্গা বাঁধঘাট এলাকা থেকে সিদ্দিক জোমাদ্দারের মালিকানাধীন ‘এমভি সিদ্দিক’ নামের একটি ‘Fishing Trawler’ ছয়জন জেলে নিয়ে গভীর সমুদ্রে রওয়ানা হয়। টানা দুদিন মাছ ধরার পর বুধবার রাতে সমুদ্রের ‘পাইপ বয়া’ (স্থানীয় জেলেদের দেওয়া নাম) এলাকায় ট্রলারটি নোঙর করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু রাত সাড়ে ১২টার দিকে আবহাওয়া হঠাৎ প্রতিকূল হয়ে ওঠে। তীব্র ঝড়ো হাওয়া ও উত্তাল ঢেউয়ের তোড়ে ট্রলারের নিচের অংশে ছিদ্র হয়ে পানি ঢুকতে শুরু করে এবং মুহূর্তের মধ্যেই সেটি কাত হয়ে ডুবে যায়।

পাঁচ ঘণ্টার মরণপণ সংগ্রাম ও অলৌকিক বেঁচে ফেরা

দুর্ঘটনার সময় ট্রলারে থাকা মালিক মো. সিদ্দিক জোমাদ্দার (৫৫), শাওন (২৪), রাব্বী (১৮) ও রাসেদ (২০) কোনোক্রমে ট্রলারের ভাসমান অংশ ধরে সাগরে ভেসে থাকেন। কনকনে শীত আর বিশাল ঢেউয়ের মাঝে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর বৃহস্পতিবার ভোরে কাছাকাছি থাকা অন্য একটি ট্রলার তাদের উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত জেলেদের কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হলে প্রাথমিক ‘Medical Treatment’ শেষে তারা বাড়িতে ফিরে আসেন। তবে সেই রাতেই নিখোঁজ হয়ে যান শামীম ও তাঁর শিশু সন্তান সিয়াম।

হৃদয়বিদারক উদ্ধার অভিযান

নিখোঁজ স্বজনদের উদ্ধারে বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই স্থানীয় জেলে ও স্বজনরা সাগরে তল্লাশি শুরু করেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর বুধবার সন্ধ্যায় ডুবে যাওয়া ট্রলারের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় শামীমের মরদেহ। এর পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে একই এলাকায় সাগরের পানিতে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায় ১১ বছরের শিশু সিয়ামের নিথর দেহ। নিজের বড় ছেলে ও নাতির লাশ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন ট্রলার মালিক সিদ্দিক জোমাদ্দার। তিনি উপকূলীয় মৎস্যজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ ও ‘Safety Equipment’ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

প্রশাসনের বক্তব্য ও সীমাবদ্ধতার চিত্র

কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক বিকাশ চন্দ্র মণ্ডল জানিয়েছেন, নিখোঁজের খবর পাওয়ার পরপরই মহিপুর ‘Coast Guard’ ও রাঙ্গাবালী থানাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছিল। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, প্রতিকূল আবহাওয়ায় গভীর সমুদ্রে বড় ধরনের উদ্ধারকাজ চালানোর জন্য নৌ-পুলিশের নিজস্ব ‘Rescue Capability’ বা উদ্ধার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। অন্যদিকে, রাঙ্গাবালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শিরাজুল ইসলাম জানান, আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে জেলেদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বঙ্গোপসাগরে ইলিশ শিকারে গিয়ে প্রতিবছরই অসংখ্য জেলে প্রাণ হারান। শামীম ও সিয়ামের এই মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল সমুদ্রগামী ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের জীবনের অনিশ্চয়তা ও পর্যাপ্ত জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জামের অভাবের কথা।

Tags: rescue operation bay of bengal patuakhali news trawler capsize father son fishing accident coast guard sea tragedy missing fishermen marine safety