সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা ও বিচারহীনতা চলমান
গোলটেবিল সংলাপে বক্তারা দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে গভীর শঙ্কা ও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের ঘটনা এবং এর বিচারহীনতা অব্যাহত রয়েছে। বক্তাদের দাবি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংখ্যালঘুদের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্বের সুযোগ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত সম-অধিকার, সম-মর্যাদা ও ধর্মনিরপেক্ষতা আজ চ্যালেঞ্জের মুখে। তাঁরা আরও উল্লেখ করেন, মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে এবং বহুত্ববাদকে সরিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাকে দুর্বল করা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের মূলনীতির পরিপন্থী। এ বাস্তবতায় সংখ্যালঘু মানুষের মানবাধিকার আন্দোলনকে দেশের সকল নাগরিকের আন্দোলনে পরিণত করার আহ্বান জানানো হয়।
গুরুত্বপূর্ণ দাবি ও প্রস্তাবনা
সংলাপে ঐক্য পরিষদের পক্ষ থেকে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট দাবি সম্বলিত নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দাবি হলো— সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন। এছাড়া, অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন; জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে সরকার, সংসদ ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল সংস্থায়, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনীতে অংশীদারিত্ব ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা; সংখ্যালঘুদের সরাসরি ভোটে সংসদে ৬০টি আসন সংরক্ষণ; দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ ও বৈষম্যবিলোপ আইন প্রণয়নের দাবি জানানো হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, তিন জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করা হয়।
নিরাপত্তাহীনতা ও বিভাজনের রাজনীতি
অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ধর্মভিত্তিক বিভাজনের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত দেশের সার্বভৌমত্ব, সমাজ ও অর্থনীতিকে দুর্বল করবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে নিরাপত্তাবোধের অভাব শুধু ধর্মীয় বা জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নারী, মাজার ও সুফির মতো বিভিন্ন দার্শনিক চিন্তাভাবনার মানুষ, ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটি, আহমদিয়া সম্প্রদায়সহ অনেকের জন্যই এটি একটি সার্বিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য নিরপেক্ষ প্রশাসনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
টিআইবি'র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কর্তৃত্ববাদের অবসান না হলে সব নাগরিকের সমঅধিকার ও সমমর্যাদা সবসময় উপেক্ষিত হবে। তাঁর মতে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় আক্রমণ ও সহিংসতা রোধে সুনির্দিষ্ট আইন ও কমিশন থাকা জরুরি। তিনি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দাবি আদায়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
নির্বাচন ও ভোটাধিকার
বক্তারা গভীর শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, কোনো কোনো গোষ্ঠী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে ধর্মকে যথেচ্ছ ব্যবহার করছে এবং নির্বাচনে পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নানাভাবে টার্গেট করে হুমকি, হামলা ও নির্যাতন করা হচ্ছে। তাঁরা সতর্ক করে দেন যে সরকার, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে সংখ্যালঘুরা ভোটদানে নিরুৎসাহিত হতে পারে।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, আমাদের নীরবতার কারণে সব ক্ষেত্রেই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা আইনের সুরক্ষা পাচ্ছে না। সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল আজিজ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে সামনের নির্বাচনে বুঝে-শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানান, যেন প্রতিবাদের জায়গাটা অন্তত খোলা থাকে।
আলোচক ও অংশগ্রহণকারী
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি নির্মল রোজারিওর সভাপতিত্বে এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য রঞ্জন কর্মকারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সংলাপে বক্তব্য দেন— ড. ইফতেখারুজ্জামান (টিআইবি), ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য (অর্থনীতিবিদ), ব্যারিস্টার সারা হোসেন (আইনজীবী), অধ্যাপক ড. নিম চন্দ্র ভৌমিক (ঐক্য পরিষদ), ডা. ফওজিয়া মোসলেম (বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ), শামসুল হুদা (এএলআরডি), অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী (গণফোরাম), সিনিয়র সাংবাদিক আব্দুল আজিজ প্রমুখ। ঐক্য পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ সংলাপে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন।