• জাতীয়
  • বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন মোড়: পিএসসি সংশোধনে উচ্চপর্যায়ের কমিটি, বিদেশি কোম্পানি টানতে বড় ছাড়ের আভাস

বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন মোড়: পিএসসি সংশোধনে উচ্চপর্যায়ের কমিটি, বিদেশি কোম্পানি টানতে বড় ছাড়ের আভাস

জাতীয় ১ মিনিট পড়া
বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন মোড়: পিএসসি সংশোধনে উচ্চপর্যায়ের কমিটি, বিদেশি কোম্পানি টানতে বড় ছাড়ের আভাস

জ্বালানি সংকট মোচনে গভীর সমুদ্রে 'ব্লু-ইকোনমি'র দ্বার খুলতে মরিয়া অন্তর্বর্তী সরকার; ১৫ জানুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত সুপারিশের নির্দেশ।

দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট নিরসনে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশিতে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন করে তৎপরতা শুরু করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে (International Oil Companies - IOC) আকৃষ্ট করতে না পেরে আগের সরকারের করা 'উৎপাদন বণ্টন চুক্তি' বা ‘Production Sharing Contract’ (PSC)-২০২৫ পুনরায় পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ একটি উচ্চপর্যায়ের ৯ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে, যাদের আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ব্যর্থতার বৃত্ত ভাঙার চেষ্টা

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে সমুদ্রের ২৪টি ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলেও বিশ্বখ্যাত কোনো ‘Tech Giant’ বা বড় জ্বালানি সংস্থা তাতে সাড়া দেয়নি। সেই হোঁচট সামলে উঠতে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য পিএসসি-কে আরও ‘আকর্ষণীয়’ করতে বর্তমান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান নতুন করে পর্যালোচনার নির্দেশনা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৭ ডিসেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ (EMRD) একটি দাপ্তরিক আদেশ জারি করে। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসীনকে এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে এবং পেট্রোবাংলাকে প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

কমিটির কাঠামো ও কার্যপরিধি

৯ সদস্যের এই পর্যালোচনামূলক কমিটিতে রাখা হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদদের। কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের ভিসি অধ্যাপক ড. এম তামিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস এম মাইকেল কবির, এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রথিতযশা ব্যারিস্টার ড. সিনথিয়া ফরিদ। পেট্রোবাংলার বিভিন্ন বিভাগের মহাব্যবস্থাপকরাও এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত থাকবেন।

কমিটির মূল কাজ হলো 'Offshore Model PSC 2025'-এর খসড়া এবং এতে অন্তর্ভুক্ত নতুন বিধানসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা। বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমাতে এবং বৈশ্বিক বাজারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক ‘Model Production Sharing Contract’ তৈরি করাই এর প্রধান লক্ষ্য।

পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষেত্র: দাম ও ইনসেনটিভ

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে ফেরাতে গ্যাসের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণে আমূল পরিবর্তন আনা হতে পারে। আগে যেখানে গ্যাসের দাম ফার্নেস অয়েল (HSFO) ভিত্তিক ছিল, নতুন মডেলে তা আন্তর্জাতিক বাজারের ‘Brent Crude’ অয়েলের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়াও পেমেন্টের ক্ষেত্রে ‘LIBOR’-এর পরিবর্তে আধুনিক ‘SOFR’ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে ‘Cost Recovery’ বা বিনিয়োগ করা অর্থ তুলে নেওয়া এবং ‘Workers’ Profit Participation Fund’ (WPPF) নিয়ে। মার্কিন কোম্পানি এক্সনমবিল (ExxonMobil) এবং শেভরন (Chevron) এর আগে মুনাফার ৫ শতাংশ শ্রমিক কল্যাণ তহবিলে প্রদানের বিধান নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। বর্তমান কমিটি এই বিধান শিথিল করার বিষয়ে সুপারিশ করতে পারে। এছাড়াও গভীর সমুদ্র থেকে স্থলভাগ পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের বিশাল খরচ বা ‘Transmission Charge’ এবং ডাটা বিক্রির প্যাকেজ মূল্য নিয়েও ব্যাপক সংস্কারের সম্ভাবনা রয়েছে।

এক দশকের স্থবিরতা ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার জলসীমার মালিকানা পেলেও গত এক দশকে সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলনে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এর আগে ২০১০ সালে মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপস কাজ শুরু করলেও গ্যাসের দাম বাড়ানোর দাবি পূরণ না হওয়ায় তারা কাজ ছেড়ে চলে যায়। একইভাবে চুক্তির পর মাঠ ছাড়ে অস্ট্রেলিয়ার সান্তোস ও দক্ষিণ কোরিয়ার পস্কো দাইয়ু।

আন্তর্জাতিক বাজারে শেল গ্যাস (Shale Gas) ও রিনিউয়েবল এনার্জির দাপটের এই সময়ে গভীর সমুদ্রে ঝুঁকি নিয়ে বিনিয়োগ করতে চায় না অনেক বড় কোম্পানি। তবে এক্সনমবিল, শেভরন, মালয়েশীয় পেট্রোনাস এবং জাপানি ইনপেক্স করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও বঙ্গোপসাগরের প্রতি আগ্রহ জিইয়ে রেখেছে। সংশোধিত পিএসসি যদি তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে, তবেই বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

১৫ জানুয়ারি কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। দেশের ভবিষ্যতের ‘Energy Security’ নিশ্চিত করতে এই পিএসসি সংশোধন কতটুকু কার্যকর হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

Tags: brent crude bay of bengal energy security offshore exploration psc 2025 petrobangla news oil and gas investment incentives maritime boundary fuel crisis