বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী এবং মোহময়ী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। চিরবিদায় নিলেন ফরাসি সিনেমার কিংবদন্তি অভিনেত্রী, মডেল এবং সংগীতশিল্পী ব্রিজিত বার্দো। রোববার (২৮ ডিসেম্বর) ৯১ বছর বয়সে প্যারিসে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বার্দোর মৃত্যুর সংবাদটি নিশ্চিত করেছে তার নিজস্ব চ্যারিটেবল সংস্থা ‘ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন’। তবে বার্দোর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
মডেলিং থেকে রুপালি পর্দার সম্রাজ্ঞী
১৯৩৪ সালে প্যারিসের এক সচ্ছল পরিবারে জন্ম নেয়া ব্রিজিত বার্দোর শৈশব কেটেছিল ব্যালে নাচের তালিম নিয়ে। নাচের প্রতি গভীর অনুরাগ থাকলেও তার সৌন্দর্য এবং ব্যক্তিত্ব তাকে দ্রুতই গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ডের দিকে টেনে নিয়ে যায়। মাত্র ১৫ বছর বয়সে ১৯৫০ সালে বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ম্যাগাজিন ‘এল’ (Elle)-এর প্রচ্ছদে জায়গা করে নিয়ে হৈচৈ ফেলে দেন তিনি। এই একটি কভার ফটোই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং তাকে সরাসরি সিনেমার অডিশন ফ্লোরে পৌঁছে দেয়।
‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড উইম্যান’: বৈশ্বিক তারকা হয়ে ওঠা
বার্দোর অভিনয় জীবনের টার্নিং পয়েন্ট ছিল ১৯৫৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ‘অ্যান্ড গড ক্রিয়েটেড উইম্যান’ (And God Created Woman)। তার তৎকালীন স্বামী, পরিচালক রজার ভাদিমের হাত ধরে নির্মিত এই সিনেমাটি তাকে রাতারাতি ‘গ্লোবাল স্টardom’ এনে দেয়। সিনেমাটি শুধুমাত্র ফ্রান্সেই নয়, বরং হলিউড এবং পুরো বিশ্বজুড়ে তাকে এক নতুন ‘স্টাইল আইকন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এরপর তিনি একে একে উপহার দেন ‘দ্য ট্রুথ’, ‘ভেরি প্রাইভেট অ্যাফেয়ার’ এবং জ্যঁ-লুক গোদারের মাস্টারপিস ‘কনটেম্পট’-এর মতো কালজয়ী সিনেমা। ‘ভিভা মারিয়া’ কিংবা ‘শালাকো’-র মতো হলিউড প্রজেক্টেও তিনি সমান দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
গ্ল্যামারের তুঙ্গে থাকতেই স্বেচ্ছায় প্রস্থান
সত্তরের দশকে যখন তিনি জনপ্রিয়তার মধ্যগগনে, তখনই এক বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত নেন ব্রিজিত বার্দো। ১৯৭৩ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ‘দ্য এডিফাইং অ্যান্ড জয়াস স্টোরি অব কলিনো’ সিনেমার পর তিনি অভিনয় থেকে চিরতরে অবসরের ঘোষণা দেন। তার এই প্রস্থান ছিল অনেকটা সিনেমার গল্পের মতোই আকস্মিক। গ্ল্যামার জগত থেকে দূরে সরে গিয়ে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেন প্রাণীদের সুরক্ষায়। প্রতিষ্ঠা করেন ‘ব্রিজিত বার্দো ফাউন্ডেশন’, যা বর্তমানে প্রাণীদের অধিকার রক্ষায় বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সংস্থা।
বিতর্ক ও শেষ জীবন
পরবর্তী জীবনে ব্রিজিত বার্দো যেমন তার মানবিক কাজের জন্য প্রশংসিত হয়েছেন, তেমনি তার রাজনৈতিক অবস্থান ও একাধিক বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। অভিবাসন এবং বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায় নিয়ে তার কিছু কট্টর বক্তব্যের কারণে ফ্রান্সে তাকে একাধিকবার আইনি জটিলতা ও জরিমানার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তবে বিতর্ক ছাপিয়েও বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি থেকে যাবেন এক অদম্য এবং স্বাধীনচেতা নারী হিসেবে, যিনি পর্দায় নারী স্বাধীনতার নতুন সংজ্ঞা লিখেছিলেন।
ব্রিজিত বার্দোর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে ফ্রান্সসহ পুরো বিশ্বের বিনোদন অঙ্গনে। ফরাসি সংস্কৃতি এবং বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে এক সোনালী যুগের অবসান হলো আজ।