• রাজনীতি
  • একটি মহাকাব্যের অবসান: সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই

একটি মহাকাব্যের অবসান: সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই

রাজনীতি ১ মিনিট পড়া
একটি মহাকাব্যের অবসান: সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৮০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন ‘আপসহীন’ এই জননেত্রী; দেশজুড়ে শোকের ছায়া এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি।

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫) বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

শোকাতুর রাজনৈতিক অঙ্গন ও সংবাদ নিশ্চিতকরণ

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন বিএনপির তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘদিনের প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান। তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সারা দেশে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রিয় নেত্রীকে শেষবারের মতো দেখতে হাসপাতালের সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেছেন দলীয় নেতা-কর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

মরণপণ লড়াই ও শেষ মুহূর্তের পরিস্থিতি

এর আগে সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) দিবাগত রাত ২টায় বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড জাহিদ হোসেন অত্যন্ত উদ্বেগজনক বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, “বেগম জিয়া অত্যন্ত সংকটময় মুহূর্ত (Critical condition) পার করছেন। তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়েছে।” উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার বিদেশ নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। গত ২৩ নভেম্বর ফুসফুসে সংক্রমণ ও অন্যান্য জটিলতা নিয়ে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ২৭ নভেম্বর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাকে কেবিন থেকে দ্রুত ‘ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে’ (CCU) স্থানান্তর করা হয়।

জটিল রোগব্যাধি ও মাল্টি-অর্গান কমপ্লিকেশান

দীর্ঘদিন ধরেই বেগম খালেদা জিয়া ‘মাল্টি-অর্গান’ (Multi-organ) স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকদের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও তার লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ (Heart Disease), অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো কঠিন সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এছাড়া আথ্রাইটিস ও বার্ধক্যজনিত নানা ইনফেকশন তার শরীরকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল। হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত একটি মেডিকেল বোর্ড নিয়মিত তার চিকিৎসার তদারকি করলেও শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মানতে হলো এই কিংবদন্তি নেত্রীকে।

দিনাজপুর থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু: এক বর্ণাঢ্য জীবন

১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা জিয়ার শৈশব কেটেছে উত্তরবঙ্গের স্নিগ্ধ পরিবেশে। বাবা ইস্কান্দার মজুমদার ও মা তৈয়বা বেগমের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। তার পৈতৃক নিবাস ফেনী জেলার পরশুরামের শ্রীপুর গ্রামে। জন্মের পর তার নাম রাখা হয়েছিল ‘খালেদা খানম’, তবে অনন্য রূপ ও স্নিগ্ধতার কারণে পরিবারের সদস্যরা ভালোবেসে তাকে ‘পুতুল’ বলে ডাকতেন।

তার শিক্ষাজীবন শুরু হয় দিনাজপুরের সেন্ট যোসেফ কনভেন্টে। পরবর্তীতে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট সম্পন্ন করেন তিনি। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিপাটি ও রুচিশীল। বিশেষ করে ফুলের প্রতি তার ছিল এক গভীর অনুরাগ। নিজের ঘর পরিচ্ছন্ন রাখা এবং ফুল দিয়ে সাজানোর যে অভ্যাস শৈশবে গড়ে উঠেছিল, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা তিনি বজায় রেখেছিলেন।

অদম্য নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে পর্দার অন্তরালে থাকলেও, স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯৮০-এর দশকে কঠিন সময়ে বিএনপির হাল ধরেন খালেদা জিয়া। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি তিনবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। তার প্রয়াণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম ও জাতীয় রাজনীতির একটি বিশাল অধ্যায়ের অবসান হলো।

তার জানাজা ও দাফন প্রক্রিয়া সম্পর্কে দলীয় ও পারিবারিক সূত্র থেকে পরবর্তীতে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানা গেছে।

Tags: bangladesh politics khaleda zia bnp news breaking news evercare hospital zia family former pm khaleda death national mourning political icon