মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitics) মানচিত্রে আবারও ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। মার্কিন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নতুন করে সামরিক হামলার হুমকির প্রেক্ষিতে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় পালটা জবাব দিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, ওয়াশিংটন যদি পুনরায় কোনো ধরনের আগ্রাসন চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে ইরান তার ‘কঠোর ও অনুশোচনাপ্রদ’ জবাব দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই উত্তেজনার খবরটি উঠে এসেছে।
ট্রাম্পের হুমকি ও মার-এ-লাগো বৈঠক
সংঘাতের নতুন এই সূত্রপাত ঘটে সোমবার (২৯ ডিসেম্বর), যখন ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন ডনাল্ড ট্রাম্প। বৈঠক পরবর্তী এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধের হুঙ্কার দেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ইরান যদি আবারও তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (Ballistic Missile) বা পারমাণবিক কর্মসূচি (Nuclear Program) সচল করার চেষ্টা করে, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী দেশটিতে বড় ধরনের অভিযান পরিচালনা করবে।
ট্রাম্পের দাবি, গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়াবহ বিমান হামলার পর তেহরান সম্ভবত গোপনে তাদের অস্ত্র কর্মসূচি পুনর্গঠন করছে। তাঁর ভাষায়, “আমার কাছে খবর আছে, তারা আবারও অস্ত্র ও সরঞ্জাম মজুত করছে। তারা ঠিক কোথায় কী করছে, তা আমাদের নখদর্পণে। আমি আশা করি, তারা এমন কিছু করবে না যাতে আমাকে আবারও বি-২ (B-2 Stealth Bomber) যুদ্ধবিমানের জ্বালানি নষ্ট করতে হয়।” মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও স্পষ্ট করেন যে, তেহরান যদি দূরপাল্লার অস্ত্র তৈরি অব্যাহত রাখে, তবে তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ‘অবিলম্বে’ ইসরায়েলি হামলাকে পূর্ণ সমর্থন দেবেন।
তেহরানের বজ্রকঠিন জবাব
ট্রাম্পের এই উসকানিমূলক বক্তব্যের চব্বিশ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকির তীব্র নিন্দা জানান। পেজেশকিয়ান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যেকোনো নতুন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রস্তুত রয়েছে এবং এর প্রতিক্রিয়া হবে শত্রুর জন্য অত্যন্ত ‘কঠোর ও অনুশোচনাপ্রদ’। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ইরান কখনোই আপস করবে না।
জুন মাসের সেই ভয়াবহ সংঘাত ও যুদ্ধবিরতি
উল্লেখ্য, চলতি বছরের শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি ছিল চরম অস্থিতিশীল। গত ১৩ জুন কোনো পূর্ব উসকানি ছাড়াই ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরু করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। জবাবে ইরানও ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। সংকটের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২২ জুন, যখন আন্তর্জাতিক আইন (International Law) লঙ্ঘন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বি-২ বোমারু বিমান দিয়ে হামলা চালায়।
পালটা ব্যবস্থা হিসেবে ইরান কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি (US Military Base) আল উদেইদ-এ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর ২৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) কার্যকর হয়েছিল। ১২ দিনের সেই সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিধ্বংসী যুদ্ধে ইরানে প্রায় সহস্রাধিক মানুষ নিহত হন, যাদের মধ্যে সামরিক কমান্ডার, পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং সাধারণ নাগরিক ছিলেন। অন্যদিকে ইরানের হামলায় ইসরায়েলেও অন্তত ২৮ জনের প্রাণহানি ঘটে।
বিশ্লেষকদের উদ্বেগ
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই নতুন হুমকি এবং তেহরানের পালটা হুঁশিয়ারি অঞ্চলটিকে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের (Full-scale War) দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার আগেই এমন রণংদেহী অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করছে। বিশ্ব সম্প্রদায় এখন গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছে, জুন মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই ওয়াশিংটন এবং তেহরান আবারও সরাসরি সংঘাতের দিকে পা বাড়ায় কি না।