ভূ-রাজনৈতিক চরম উত্তেজনার মধ্যেই মাদক পাচার মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তিতে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভেনেজুয়েলা। ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান সামরিক চাপ এবং একের পর এক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) রাজধানী কারাকাস থেকে সরাসরি সংলাপে বসার এই প্রস্তাব দেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি স্পষ্ট করেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় যেকোনো সময় এবং যেকোনো স্থানে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত তাঁর প্রশাসন।
ওয়াশিংটনের প্রতি শান্তির বার্তা
কূটনৈতিক টানাপোড়েনের এই সন্ধিক্ষণে মাদুরো ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি এক প্রকার শান্তির বার্তাই পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, “মার্কিন সরকার ভালো করেই জানে যে আমরা মাদক পাচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে চাই। আমাদের পক্ষ থেকে বারবার এ বিষয়ে আলোচনার কথা বলা হয়েছে। এখন আন্তরিক সংলাপ শুরু করার সঠিক সময়।” কেবল মাদক পাচার নয়, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নকল্পে তেল উৎপাদন (Oil Sector) এবং অভিবাসন (Migration) সমস্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকেও আলোচনার টেবিলে আনতে চান এই সমাজতান্ত্রিক নেতা।
নমনীয় হওয়ার নেপথ্যে: কারামুক্তি ও কূটনৈতিক কৌশল
মাদুরো প্রশাসনের ওপর থেকে মার্কিন চাপ কমানোর লক্ষ্যেই এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাদুরোর বিজয় নিয়ে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, তাতে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক ৮০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারীকে বছরের প্রথম দিনেই মুক্তি দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘গুডউইল জেসচার’ বা শুভেচ্ছামূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে এক ধরনের নমনীয়তার সংকেত পাঠাতে চেয়েছেন মাদুরো। তবে এর বিপরীতে ট্রাম্প প্রশাসন গত বুধবারও ভেনেজুয়েলার তেল খাতের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা (Sanctions) আরোপ করে দেশটিকে আরও কোণঠাসা করার চেষ্টা চালিয়েছে।
মার্কিন রণকৌশল ও মানবিক সংকটের অভিযোগ
গত কয়েক মাস ধরে কারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। তথাকথিত মাদকবিরোধী অভিযানের নামে গত সেপ্টেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ৩০টিরও বেশি নৌযানে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। সর্বশেষ গত বুধবারের অভিযানে ১১০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব নৌযানে অবৈধ মাদক বহন করা হচ্ছিল। তবে এই দাবির সপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো অকাট্য প্রমাণ দিতে পারেনি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই অভিযানগুলোকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ (Extrajudicial Killing) হিসেবে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
অমীমাংসিত ড্রোন হামলা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
সাক্ষাৎকারে মাদুরো মাদক পাচার নিয়ে সরব হলেও ভেনেজুয়েলার একটি বন্দরে সিআইএ (CIA)-র ড্রোন হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সফলভাবে ভেনেজুয়েলার একটি কৌশলগত বন্দরে ড্রোন হামলা (Drone Attack) পরিচালনা করেছে। সিএনএন-এর প্রতিবেদনেও এই হামলার সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার পাহাড় ডিঙিয়ে মাদুরোর এই সংলাপের প্রস্তাব আদতে কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, তা এখন নির্ভর করছে হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়ার ওপর। লাতিন আমেরিকার এই দেশটির 'মার্কেট ভ্যালু' এবং ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কথা বিবেচনায় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে বসে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়।