নদীবিধৌত ঝালকাঠি জেলার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও ঐতিহ্যবাহী নলছিটি লঞ্চঘাটের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ শরিফ ওসমান হাদি লঞ্চঘাট’ রাখা হয়েছে। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) দুপুরে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই নামকরণের ফলক উন্মোচন করেন নৌপরিবহন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের একজন বীর শহীদকে জাতীয়ভাবে চিরস্থায়ী সম্মানের আসনে আসীন করা হলো।
তারুণ্যের প্রতিবাদের এক অনন্য স্বীকৃতি
ফলক উন্মোচনকালে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ড. এম. সাখাওয়াত হোসেন শহীদ শরিফ ওসমান হাদির স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। তিনি বলেন, “শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখভাগের একজন অকুতোভয় লড়াকু। তিনি ছিলেন প্রতিবাদী তারুণ্যের প্রতীক এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র। নলছিটির এই কৃতি সন্তানের নামে ঐতিহ্যবাহী এই ঘাটটির নামকরণ করতে পেরে আমি গর্বিত। এটি কেবল একটি নাম পরিবর্তন নয়, বরং এটি আগামী প্রজন্মের কাছে দেশপ্রেম, সাহসিকতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক চিরন্তন বার্তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম।”
উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন যে, ওসমান হাদির মতো সাহসী সন্তানদের আত্মত্যাগই বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক মানচিত্র তৈরি করেছে। তাঁর নামাঙ্কিত এই ঘাটটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নাগরিক দায়িত্ববোধ এবং আধিপত্যবাদবিরোধী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করবে।
উপকূলীয় কানেক্টিভিটি ও আধুনিক অবকাঠামো উন্নয়ন
বর্তমান সরকারের উন্নয়ন দর্শনের কথা তুলে ধরে ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “প্রান্তিক ও দুর্গম উপকূলীয় অঞ্চলকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে নৌ-যোগাযোগ অবকাঠামো বা Connectivity Infrastructure উন্নয়নে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। নদীমাতৃক বাংলাদেশের অফুরন্ত সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সুষম উন্নয়ন বা Balanced Development নিশ্চিত করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।”
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (BIWTA) ইতোমধ্যে এই লঞ্চঘাটটির ব্যাপক সংস্কার ও আধুনিকায়ন (Modernization) কাজ সম্পন্ন করেছে। আধুনিক যাত্রীছাউনি, উন্নত ড্রেজিং ব্যবস্থা এবং শৃঙ্খলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই ঘাটটি এখন একটি আধুনিক ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে।
মনপুরা থেকে বাকেরগঞ্জ: নৌপথে নতুন দিগন্ত
নলছিটির এই অনুষ্ঠানের আগে শুক্রবার সকালেই উপদেষ্টা বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুর্গাপাশা ইউনিয়নে একটি নবনির্মিত লঞ্চঘাটের উদ্বোধন করেন। সেখানে তিনি বলেন, “নতুন এই ঘাটটি চালুর ফলে কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে নতুন গতি আসবে এবং স্থানীয় মানুষের যাতায়াত আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হবে।”
উল্লেখ্য, নৌপরিবহন উপদেষ্টার বিশেষ উদ্যোগেই এর আগে সমুদ্র উপকূলীয় অবহেলিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ভোলার মনপুরায় ‘শহীদ ওসমান হাদি ওয়াটার অ্যাম্বুলেন্স’ (Water Ambulance) চালু করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য ও নৌপথের এই সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো মূলত প্রান্তিক জনগণের জীবনমান বা Standard of Living উন্নয়নের প্রতিচ্ছবি।
কৃতজ্ঞতায় সিক্ত স্থানীয় জনপদ
নলছিটির কৃতি সন্তানের স্মরণে লঞ্চঘাটের নামকরণের এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এই উদ্যোগের জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। স্থানীয় নাগরিকদের মতে, এই উদ্যোগ কেবল একজন শহীদকে সম্মান জানানো নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের ন্যায়বোধ এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইকে স্বীকৃতি প্রদান।
অনুষ্ঠানে বিআইডব্লিউটিএ-এর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা, শহীদ শরিফ ওসমান হাদির পরিবারের সদস্যবৃন্দ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বিআইডব্লিউটিএ-এর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এবং জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।