নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর হাতে বন্দি হওয়ার পর চরম রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে অবশেষে নতুন নেতৃত্বের ঘোষণা এলো ভেনেজুয়েলায়। দেশটির সুপ্রিম কোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট (Interim President) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। রোববার (৪ জানুয়ারি) বিবিসির এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ
ভেনেজুয়েলার সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর আকস্মিক অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজকর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই শূন্যতা পূরণে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ডেলসি রদ্রিগেজকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। আদালত আরও জানিয়েছে, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সরকার পরিচালনার আইনি কাঠামো নিয়ে আরও নিবিড় পর্যালোচনা করা হবে। মূলত কারাকাসের রাজপথে সম্ভাব্য অরাজকতা রুখতে এবং ‘Geopolitics’ বা ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই এই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের শর্ত: সমঝোতা না কি সামরিক চাপ?
এদিকে, ভেনেজুয়েলার এই অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের পেছনে ওয়াশিংটনের বড় ধরনের প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ডেলসি রদ্রিগেজ যদি যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদা ও শর্ত অনুযায়ী কাজ করেন, তবে ভেনেজুয়েলায় সরাসরি মার্কিন সেনা মোতায়েনের (Military Deployment) প্রয়োজন পড়বে না। নিউইয়র্ক পোস্টের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, "আমরা রদ্রিগেজের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছি। তিনি বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন এবং বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।"
ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী, রদ্রিগেজ ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে রাজি হয়েছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি ভেনেজুয়েলার জন্য একটি ‘Diplomatic Transition’ বা কূটনৈতিক উত্তরণ হতে পারে, যেখানে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে ক্ষমতার রদবদল ঘটাতে চাইছে হোয়াইট হাউস।
মার্কো রুবিও ও ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দীর্ঘদিন ধরেই মাদুরো প্রশাসনের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত। তাঁর সঙ্গে রদ্রিগেজের কাজের অঙ্গীকার ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর ফলে দেশটির ওপর থাকা দীর্ঘদিনের মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও, দেশের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌমত্ব কতটা বজায় থাকবে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক।
অস্থিতিশীলতা ও জনমনে শঙ্কা
মাদুরোকে আটকের পর থেকে ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একদিকে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক মন্দা থেকে মুক্তির আশা, অন্যদিকে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপে জাতীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হওয়ার ভয়—এই দুইয়ের দোলাচলে কারাকাস। ডেলসি রদ্রিগেজ কতটা শক্ত হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন এবং সামরিক বাহিনীকে আস্থায় নিতে পারবেন কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এখন ভেনেজুয়েলার এই ‘Power Shift’-এর দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলা কি আমেরিকার মিত্র রাষ্ট্রে পরিণত হবে, না কি এটি কেবল একটি সাময়িক বন্দোবস্ত—তা সময়ই বলে দেবে।