ফুটবল প্রেমীদের জন্য ২০২৬ বিশ্বকাপ কেবল দল সংখ্যার বিচারে নয়, বরং খেলার ব্যাকরণগত পরিবর্তনের দিক থেকেও হতে যাচ্ছে এক ঐতিহাসিক আসর। আধুনিক ফুটবলে ভিএআর (VAR) এবং অফসাইডের সূক্ষ্ম হিসাব নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, ঠিক তখনই খেলার গতি ও রোমাঞ্চ বাড়াতে দুটি বড় নিয়মে পরিবর্তনের জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছে ফিফা (FIFA)। ফিফার গ্লোবাল ফুটবল ডেভেলপমেন্ট প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গারের প্রস্তাবিত নতুন অফসাইড আইন এবং ইনজুরি সংক্রান্ত ‘মেডিকেল রুলস’ ফুটবল মাঠে এক নতুন বিপ্লবের বার্তা দিচ্ছে।
অফসাইড নিয়মে আমূল বদল: ‘ডে লাইট’ থিওরির প্রত্যাবর্তন?
বর্তমান নিয়মে একজন ফরোয়ার্ডের শরীরের সামান্যতম অংশ (এমনকি আঙুলের ডগা বা কাঁধ) যদি শেষ ডিফেন্ডারের চেয়ে এগিয়ে থাকে, তবেই সেটি অফসাইড বলে গণ্য হয়। এতে অনেক নান্দনিক গোল বাতিল হয়ে যায়, যা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে অসন্তোষ কম নয়। আর্সেন ওয়েঙ্গার প্রস্তাব করেছেন, এখন থেকে একজন অ্যাটাকারের ‘পুরো শরীর’ যদি শেষ ডিফেন্ডারের চেয়ে এগিয়ে থাকে, তবেই কেবল অফসাইড হবে।
অর্থাৎ, স্ট্রাইকারের শরীরের কোনো একটি অংশও যদি ডিফেন্ডারের সঙ্গে একই লাইনে থাকে, তবে তিনি ‘অনসাইড’ হিসেবে বিবেচিত হবেন। সহজ কথায়, ডিফেন্ডার এবং স্ট্রাইকারের মধ্যে স্পষ্ট ব্যবধান বা ‘Clear Daylight’ থাকলেই কেবল বাঁশি বাজবে। ১৯৯০ বিশ্বকাপের আগে গোল সংখ্যা বাড়াতে এমন একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এবার ২০২৬ বিশ্বকাপের আগে সেটি পুনরায় কার্যকর হলে গোল করার হার এবং ম্যাচের উত্তেজনা বহুগুণ বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাস্তবায়ন ও ট্রায়াল পর্যায়
এই নতুন নিয়মটি সরাসরি মূল পর্বে আসার আগে বর্তমানে ‘Youth Level’-এ পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হচ্ছে। আগামী ২০ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের (IFAB) বার্ষিক সভায় এটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। সেখানে সবুজ সংকেত পাওয়া গেলে ২০২৬-২৭ মৌসুম থেকে এটি বৈশ্বিক ফুটবলে স্থায়ীভাবে কার্যকর হতে পারে।
সময়ক্ষেপণ রুখতে কড়া ‘মেডিকেল রুলস’
ফুটবল মাঠের অন্যতম বিরক্তিকর বিষয় হলো সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা দলের ফুটবলারদের ‘ইচ্ছাকৃত’ ইনজুরির ভান করে সময় নষ্ট করা। খেলার এই ‘Momentum’ নষ্ট করার অপকৌশল বন্ধ করতে ফিফা এবার মারমুখী অবস্থানে।
নতুন প্রস্তাবিত মেডিকেল রুলস অনুযায়ী, যদি কোনো ফুটবলার চিকিৎসার জন্য মাঠের বাইরে যান, তবে তাকে অন্তত ২ মিনিটের জন্য বাইরে অপেক্ষা করতে হবে। এই সময়ে তার দল মাঠে ১০ জন নিয়ে খেলা চালিয়ে যেতে বাধ্য হবে। রেফারি অনুমতি দিলেই কেবল ২ মিনিট পর তিনি পুনরায় মাঠে প্রবেশ করতে পারবেন। ইতিমধ্যে আরব কাপে (Arab Cup) এই নিয়ম প্রয়োগ করে ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে।
বিতর্ক ও গোলরক্ষক ইস্যু
ফিফার এই ‘২ মিনিট রুল’ নিয়ে ইতিমধ্যে ফুটবল মহলে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের প্রশ্ন, যদি কোনো দলের গোলরক্ষক (Goalkeeper) ইনজুরির শিকার হন এবং তাকে ২ মিনিটের জন্য মাঠের বাইরে থাকতে হয়, তবে কি ওই দল গোলরক্ষক ছাড়াই খেলবে? এই বিষয়ে ফিফার পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে ফুটবল বিশ্লেষকদের ধারণা, গোলরক্ষকদের ক্ষেত্রে এই নিয়মে কিছুটা শিথিলতা আনা হতে পারে।
ফুটবলের নতুন দিগন্ত
ফিফার এই সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে ইতিহাসের সবচেয়ে ‘হাই-স্কোরিং’ এবং গতিশীল টুর্নামেন্ট। প্রযুক্তি ও ট্র্যাডিশনের মেলবন্ধনে ফুটবলকে আরও জনপ্রিয় ও দর্শকবান্ধব করাই এখন ফিফার মূল লক্ষ্য। এখন দেখার বিষয়, ২০ জানুয়ারি আইএফএবি-র সভায় এই বৈপ্লবিক প্রস্তাবগুলো কতটুকু স্বীকৃতি পায়।