চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকা চন্দনপুরায় এক চাঞ্চল্যকর সশস্ত্র হামলার ঘটনায় বন্দরনগরীর ব্যবসায়ী ও শিল্প মহলে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যানের বাসভবন লক্ষ্য করে প্রকাশ্য দিবালোকে ২২ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করেছে একদল মুখোশধারী সন্ত্রাসী। অভিযোগ উঠেছে, দুবাই ভিত্তিক একটি আন্তর্জাতিক চক্রের কোটি টাকা চাঁদার দাবি পূরণ না করায় এই সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়েছে। এ ঘটনায় দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ ও শিল্পোদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিজিএমইএ (BGMEA)।
সিসিটিভি ফুটেজে রোমহর্ষক দৃশ্য
গত শুক্রবার (২ জানুয়ারি) ভোর ঠিক সাড়ে ছয়টা। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সাত থেকে আটজনের একটি সশস্ত্র ও মুখোশধারী দল অতর্কিতে স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমানের বাসভবন ঘিরে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যেই তারা অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে বাড়ির মূল ফটক, নিরাপত্তারক্ষীদের কক্ষ এবং জানালার কাঁচ লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রায় ২২ রাউন্ড গুলি ছুড়ে এলাকা প্রকম্পিত করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে দুষ্কৃতিকারীরা। গুলির শব্দে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, স্থানীয় বাসিন্দারা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন।
দুবাই কানেকশন ও কোটি টাকার চাঁদাবাজি
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে স্মার্ট গ্রুপের পরিচালকদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে দুবাই ভিত্তিক একটি নম্বর থেকে কল করে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। এই ডিজিটাল হুমকির মুখে নতিস্বীকার না করায় সন্ত্রাসীরা সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই ভয়াবহ হামলা চালায়। ঘটনার সময় নিরাপত্তারক্ষীরা ভেতরে থাকায় বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি ঘটেনি, তবে স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মনে করছে, এটি কেবল সাধারণ চাঁদাবাজি নয়, বরং একটি সুসংগঠিত ‘Security Threat’ যা দেশের শিল্প খাতের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে।
শিল্পাঙ্গনে উদ্বেগ: বিজিএমইএ-র কড়া বার্তা
দেশের অন্যতম শীর্ষ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিকের ওপর এমন নগ্ন হামলায় নড়েচড়ে বসেছে বিজিএমইএ। সংগঠনটি ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত চিঠি পাঠিয়ে দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে। বিজিএমইএ-র পরিচালক সাইফ উল্লাহ মনসুর বলেন, "একটি দেশের অর্থনীতি তখনই বিকশিত হয় যখন সেখানে Industrial Stability এবং উদ্যোক্তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে। যখন আমরা Global Supply Chain-এ নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার চেষ্টা করছি এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শিল্পকে এগিয়ে নিচ্ছি, তখন এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে।"
তিনি আরও যোগ করেন যে, "দেশের Job Creation এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে স্মার্ট গ্রুপের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অবিলম্বে অপরাধীদের আইনের আওতায় না আনলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাবেন।"
পুলিশি তৎপরতা ও তদন্তের অগ্রগতি
ঘটনার পরপরই স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যানের বাসভবনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবুল আজাদ জানিয়েছেন, "প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে চাঁদা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শনের জন্য এই হামলা চালানো হয়েছে। আমরা অপরাধীদের শনাক্ত করতে ডিজিটাল ফরেনসিক ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছি। দুবাই থেকে আসা কলগুলোর উৎস সন্ধানেও কাজ চলছে।" তবে ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও এখনো পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক সংশ্লেষ
হামলার শিকার স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাঁশখালী থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁর ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, এই হামলা তারই প্রতিফলন কি না, তা নিয়েও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তদন্ত করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পপতিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যেখানে আধুনিক বিশ্বে ব্যবসা এখন AI এবং Data Center কেন্দ্রিক উচ্চপ্রযুক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেখানে সনাতনী কায়দায় এই 'Armed Violence' বন্ধ করতে না পারলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে দেশ।