ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই দক্ষিণ এশিয়ার জনবহুল শহরগুলোতে ফিরে এসেছে বায়ুদূষণের চিরচেনা আতঙ্ক। দীর্ঘদিনের দূষণকবলিত মেগাসিটি ঢাকার বায়ুমান মাঝে কিছুটা স্বস্তিদায়ক অবস্থানে থাকলেও, সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে পরিস্থিতির ফের অবনতি হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকালে আন্তর্জাতিক বায়ুমান প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইকিউএয়ার (IQAir)-এর রিয়েল-টাইম তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় রাজধানী ঢাকা পুনরায় ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ঢাকার বায়ুমানের বর্তমান চিত্র
সোমবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আইকিউএয়ারের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, ১৫৩ স্কোর নিয়ে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ১৫তম অবস্থানে রয়েছে ঢাকা। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, এই মানের বাতাসের অর্থ হলো সাধারণ মানুষের জন্য এটি ‘অস্বাস্থ্যকর’ (Unhealthy)। বিশেষ করে যারা ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছেন বা সংবেদনশীল, তাদের জন্য এই পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। কয়েক দিন আগেও ঢাকার বায়ুমানের কিছুটা উন্নতি লক্ষ্য করা গিয়েছিল, তবে শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় ধূলিকণা ও ধোঁয়ার প্রভাবে দূষণ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
শীর্ষে দিল্লি, বিপর্যস্ত দক্ষিণ এশিয়া
এবারের তালিকায় বায়ুদূষণের শীর্ষে রয়েছে ভারতের রাজধানী দিল্লি। ১৯৮ স্কোর নিয়ে শহরটি বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত বাতাসের নগরের তকমা পেয়েছে। দিল্লির পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য শহরগুলোর চিত্রও উদ্বেগজনক। ১৮৫ স্কোর নিয়ে তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তানের করাচি। তৃতীয় অবস্থানে থাকা বাহরাইনের রাজধানী মানামার স্কোর ১৮২। এছাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে পাকিস্তানের লাহোর (১৭৮) এবং ভারতের কলকাতা (১৭৭)। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, দক্ষিণ এশিয়ায় বায়ুদূষণ এখন একটি বড় ধরণের আঞ্চলিক সংকট (Regional Crisis) হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
একিউআই (AQI) সূচক ও স্বাস্থ্যঝুঁকির সমীকরণ
বায়ুমান সূচক বা Air Quality Index (AQI) মূলত পাঁচটি দূষণকারীর ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়— পার্টিকুলেট ম্যাটার (PM10 ও PM2.5), নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইড (NO2), কার্বন মনোক্সাইড (CO), সালফার ডাই অক্সাইড (SO2) এবং ওজোন (O3)।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, একিউআই স্কোর:
০ থেকে ৫০: উন্নত বা ভালো (Good)।
৫১ থেকে ১০০: মাঝারি (Moderate)।
১০১ থেকে ১৫০: সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর।
১৫১ থেকে ২০০: অস্বাস্থ্যকর (Unhealthy)।
২০১ থেকে ৩০০: খুব অস্বাস্থ্যকর (Very Unhealthy)।
৩০১ এর উপরে: বিপজ্জনক বা ঝুঁকিপূর্ণ (Hazardous)।
জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা
স্কোর যখন ১৫১ থেকে ২০০ এর মধ্যে থাকে, তখন নগরের সাধারণ বাসিন্দাদেরও স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগীদের জন্য ঘরের বাইরের কার্যক্রম সীমিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়। বায়ুমান যদি ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ (২০১-৩০০) বা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ (৩০১+) পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি অবস্থা বা হেলথ ইমারজেন্সি হিসেবে বিবেচিত হয়। চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিতে বাইরে বের হওয়ার সময় উন্নত মানের মাস্ক (N95 বা সমমানের) ব্যবহারের তাগিদ দিচ্ছেন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, যানবাহনের কালো ধোঁয়া এবং শুষ্ক মৌসুমে রাস্তাঘাট পরিষ্কার না করার ফলে ঢাকার বায়ুমান প্রতিনিয়ত নিম্নমুখী হচ্ছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এই মেগাসিটির জনস্বাস্থ্য বড় ধরণের বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে।