ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক নাটকীয় মোড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযানে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হয়ে নিউ ইয়র্কের কারাগারে যাওয়ার পর যারা ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় বিষোদগার করছিলেন, তাদের সুরে এখন স্পষ্ট পরিবর্তনের আভাস। খোদ ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ, যিনি এতদিন মার্কিন হস্তক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে আসছিলেন, তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সহযোগিতার এজেন্ডা’ নিয়ে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি হুমকির পরই এই কৌশলগত পিছুটান দিলেন রদ্রিগেজ।
ট্রাম্পের সেই কড়া হুঁশিয়ারি
সম্প্রতি মার্কিন সাময়িকী ‘দ্য আটলান্টিক’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন। তিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে উদ্দেশ্য করে বলেন, তিনি যদি ‘সঠিক কাজটি না করেন’, তবে তাকে মাদুরোর চেয়েও ‘বড় মূল্য’ দিতে হতে পারে। ট্রাম্পের এই সরাসরি আল্টিমেটাম বা ‘Ultimatum’ কারাকাসের ক্ষমতার অলিন্দে যে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে, তা রদ্রিগেজের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট।
১৮০ ডিগ্রি ঘুরে দাঁড়িয়ে ‘সহযোগিতার এজেন্ডা’
ট্রাম্পের হুমকির রেশ কাটতে না কাটতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে সুর পাল্টেছেন ডেলসি রদ্রিগেজ। তিনি ওয়াশিংটনকে একটি ‘Cooperation Agenda’ বা সহযোগিতার রূপরেখা নিয়ে কাজ করার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। রদ্রিগেজ বলেন, “ভেনেজুয়েলা আন্তর্জাতিক আইনের (International Law) কাঠামোর মধ্যে থেকে পারস্পরিক উন্নয়ন এবং দীর্ঘস্থায়ী ও স্থিতিশীল সহাবস্থান নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে চায়।”
তিনি আরও যোগ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে একটি ‘Balance and Respectful’ বা ভারসাম্যপূর্ণ ও সম্মানজনক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তোলাকেই এখন ভেনেজুয়েলা অগ্রাধিকার দেবে।
শান্তি ও সংলাপের আহ্বান
আগে যেখানে রদ্রিগেজের কণ্ঠে কেবল প্রতিরোধের সুর শোনা যেত, এখন সেখানে স্থান করে নিয়েছে ‘Peace and Dialogue’ বা শান্তি ও সংলাপের বার্তা। সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সম্বোধন করে তিনি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, আমাদের জনগণ এবং এই অঞ্চল শান্তি ও সংলাপের যোগ্য। এটিই ছিল নিকোলাস মাদুরোর বার্তা, আর এখন এটিই পুরো ভেনেজুয়েলার অঙ্গীকার।” বিবৃতিতে তিনি ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) রক্ষা এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের অধিকারের বিষয়টিও পুনর্ব্যক্ত করেন।
কূটনৈতিক বাধ্যবাধকতা নাকি কৌশল?
মাদুরো আটক হওয়ার ঠিক পরেই রদ্রিগেজ যেভাবে ওয়াশিংটনের সমালোচনা করেছিলেন, সেখান থেকে এই অবস্থান পরিবর্তনকে ‘Surrender’ বা নতি স্বীকার হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। তবে কেউ কেউ মনে করছেন, দেশের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা এড়াতে এবং সম্ভাব্য আরও মার্কিন সামরিক অভিযান ঠেকাতে এটি রদ্রিগেজের একটি রাজনৈতিক চাল বা ‘Geopolitical Strategy’ হতে পারে।
লাতিন আমেরিকার এই গুরুত্বপূর্ণ দেশটির ক্ষমতা কাঠামোতে যখন ভাঙন ধরেছে, তখন হোয়াইট হাউসের চাপে পড়ে রদ্রিগেজের এই ‘সুর নরম’ করা ভবিষ্যতে ভেনেজুয়েলায় একটি নতুন ধারার সরকার গঠনের পথ প্রশস্ত করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।