বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক বলিষ্ঠ রাজনৈতিক বার্তা দিয়ে বলেছেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক কাঠামোর প্রধান ভিত্তি। একাত্তরের সেই গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস ও চেতনাকে বাদ দিলে বাংলাদেশের সার্বভৌম অস্তিত্ব রক্ষা করা সম্ভব নয়। সোমবার (৫ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বাম দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’-এর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য বন্ধন
বৈঠক শেষে তারেক রহমানের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বাম নেতারা জানান, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করেন বাংলাদেশের ‘National Identity’ বা জাতীয় পরিচয়ের মূল শিকড় প্রোথিত রয়েছে একাত্তরে। তারেক রহমান বৈঠকে স্পষ্ট করে বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি যুদ্ধ নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের ‘Political Foundation’। যারা একাত্তরকে পাশ কাটিয়ে নতুন কোনো সমীকরণ মেলাতে চান, তারা মূলত দেশের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলছেন।”
বিপ্লবী সোশ্যালিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ গণমাধ্যমকে জানান, তারেক রহমান গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে একাত্তরের ভিত্তির ওপর জোর দিচ্ছেন। ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে একাত্তরের মূল চেতনার সঙ্গে সমন্বয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী তিনি।
গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তারেক রহমান নতুন সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশে একটি নতুন ‘Political Reality’ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমাদের এমন একটি ‘Democratic System’ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত হবে।” এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার, বিরোধী দল এবং সকল রাজনৈতিক শক্তিকে দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যের (National Unity) ভিত্তিতে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাব
বৈঠকে দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। তিনি মনে করেন, স্থিতিশীলতা বজায় না থাকলে উন্নয়নের পথ রুদ্ধ হতে পারে। এছাড়া একটি ‘Free and Fair Election’ বা অবাধ ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তার মতে, জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া কোনো সরকারই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারে না। তাই দ্রুততম সময়ে নির্বাচনী রূপরেখা প্রণয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া জরুরি।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক ও সহমর্মিতা
মতবিনিময় সভার শুরুতে গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের নেতারা বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। তারা আধুনিক বাংলাদেশের নির্মাণে এবং সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে বেগম জিয়ার আজীবন সংগ্রামের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বাম নেতারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বলেন, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে তাঁর অনুপস্থিতি এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করেছে।
বৈঠকে বিএনপি এবং বামপন্থীদের মধ্যে দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ‘Strategic Dialogue’ অনুষ্ঠিত হয়। উভয় পক্ষই একমত হন যে, ফ্যাসিবাদের অবশেষ নির্মূল করে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়তে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সংহতির কোনো বিকল্প নেই।