ওয়াশিংটন এবং বোগোতার মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন খাদের কিনারায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আক্রমণাত্মক মন্তব্যের জবাবে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া এক বিবৃতিতে পেত্রো স্পষ্ট জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি তার সরকার বা দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কোনো হুমকি সৃষ্টি করে, তবে মাতৃভূমি রক্ষায় তিনি আবারও ‘অস্ত্র হাতে তুলে নিতে’ দ্বিধা করবেন না।
শপথ ভেঙে রণক্ষেত্রে ফেরার ডাক
কলম্বিয়ার ইতিহাসে প্রথম বামপন্থি প্রেসিডেন্ট এবং একসময়ের দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা গুস্তাভো পেত্রো তার বার্তায় দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় সর্বোচ্চ ত্যাগের অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমি শপথ নিয়েছিলাম আর কখনও অস্ত্র স্পর্শ করব না। কিন্তু স্বদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং যেকোনো বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে আমি সেই শপথ ভাঙতে প্রস্তুত। প্রয়োজন হলে আমি আবারও অস্ত্র হাতে তুলে নেব।”
পেত্রোর এই মন্তব্য মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই প্রচ্ছন্ন হুমকির প্রতিক্রিয়া, যেখানে কলম্বিয়াকে ভেনেজুয়েলার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মুখে সরাসরি যুদ্ধের এই হুঁশিয়ারি লাতিন আমেরিকার Geopolitical মানচিত্রে নতুন অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ট্রাম্পের আক্রমণ ও ‘ভেনেজুয়েলা মডেল’
সাম্প্রতিক সময়ে কলম্বিয়া ও মার্কিন সম্পর্কের টানাপোড়েন চরমে পৌঁছেছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে পেত্রোকে ‘অসুস্থ ব্যক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে দাবি করেছেন, তার শাসনামলে কলম্বিয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন চোরাচালান বৃদ্ধি পেয়েছে। ট্রাম্পের মতে, কলম্বিয়া বর্তমানে একটি ‘অসুস্থ দেশ’ এবং এই পরিস্থিতি তিনি বেশিদিন চলতে দেবেন না।
রোববার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন যে, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসন যে ধরনের কঠোর পদক্ষেপ বা Military Intervention-এর ছক কষেছে, কলম্বিয়ার ক্ষেত্রেও তেমনটা ঘটা বিচিত্র নয়। উল্লেখ্য, মাদুরোর বিরুদ্ধে মার্কিন প্রশাসনের ধরপাকড় অভিযান এবং আন্তর্জাতিক আদালতে মাদক পাচারের অভিযোগকে অনেক দেশই International Law বা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখে থাকে। পেত্রো মনে করেন, ট্রাম্প এখন কলম্বিয়াকেও সেই একই ছকে বাঁধার চেষ্টা করছেন।
কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘনের অভিযোগ
হোয়াইট হাউসের এই শত্রুতাপূর্ণ আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কলম্বিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের মন্তব্য কলম্বিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ‘অযৌক্তিক এবং অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ’। এটি সম্পূর্ণভাবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রোটোকল এবং রীতিনীতির পরিপন্থী। বোগোতার দাবি, মাদক পাচার বা Drug Trafficking-এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের দোহাই দিয়ে কোনো দেশের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানা যায় না।
সংঘাতের নেপথ্যে আদর্শিক লড়াই
গুস্তাভো পেত্রো দীর্ঘকাল ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং লাতিন আমেরিকার বামপন্থি শাসকদের প্রতি তার কঠোর মনোভাব এই দ্বন্দ্বকে আরও উসকে দিয়েছে। পেত্রো মনে করেন, লাতিন আমেরিকায় মার্কিন আধিপত্য টিকিয়ে রাখতেই তার সরকারকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কলম্বিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এই বাদানুবাদ কেবল মৌখিক স্তরে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা সরাসরি কোনো সামরিক উত্তেজনার দিকে মোড় নেবে—সেদিকেই এখন নজর বিশ্ব কূটনীতিবিদদের। তবে পেত্রোর ‘অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার’ এই ঘোষণা যে ওয়াশিংটনকে একটি কড়া বার্তা দিয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।