২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি—ভোরের কুয়াশাভেজা কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্ত এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল এক কিশোরীর আর্তনাদে। কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকা ফেলানী খাতুনের সেই নিথর দেহের ছবি নাড়িয়ে দিয়েছিল বিশ্ববিবেককে। আজ বুধবার (৭ জানুয়ারি) সেই ট্র্যাজেডির ১৫ বছর পূর্ণ হলো। দীর্ঘ এই সময়ে বিশ্ব রাজনীতি ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে অনেক পটপরিবর্তন হলেও বদলায়নি শুধু ফেলানীর মা-বাবার চোখের জল। কাঁটাতারের বেড়ায় যেমন দীর্ঘ সময় ঝুলে ছিল ফেলানীর মরদেহ, ঠিক তেমনি ভারতের উচ্চ আদালতে আজও ঝুলে আছে এই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া।
কাঁটাতারে বিদ্ধ স্বপ্ন ও একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কলনিটারী গ্রামের নুর ইসলাম ও জাহানারা দম্পতির বড় সন্তান ছিল ফেলানী। অভাবের তাড়নায় সপরিবারে ভারতে পাড়ি জমিয়েছিলেন তারা। ২০১১ সালের সেই ভোরে বাবার সঙ্গে বাংলাদেশে ফিরছিল কিশোরী ফেলানী, উদ্দেশ্য ছিল বিয়ে। কিন্তু দালালের মাধ্যমে মই বেয়ে কাঁটাতার পার হওয়ার সময় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (BSF) সদস্য অমিয় ঘোষের রাইফেল থেকে ছুটে আসা বুলেট বিদ্ধ করে ফেলানীর বুক। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা কাঁটাতারে ঝুলে ছিল তার প্রাণহীন দেহ। সেই নির্মম ছবি আজও দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্ত ব্যবস্থাপনার এক কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
বিচারের নামে প্রহসন ও আইনি দীর্ঘসূত্রতা
বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনার মুখে ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে বিএসএফ-এর বিশেষ আদালতে (General Security Force Court) ফেলানী হত্যার বিচার শুরু হয়। কিন্তু অভাবনীয়ভাবে দু’দফায় অভিযুক্ত অমিয় ঘোষকে বেকসুর খালাস দেয় সেই আদালত। বিএসএফ-এর নিজস্ব আদালতের এই রায়কে ‘বিচারের নামে প্রহসন’ বলে আখ্যা দেন মানবাধিকার কর্মীরা।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই ভারতীয় মানবাধিকার সংগঠন ‘মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ’ (MASUM)-এর সহযোগিতায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট পিটিশন (Writ Petition) দাখিল করেন ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম। এরপর কয়েক দফা শুনানির দিন ধার্য করা হলেও বারবার তা পিছিয়ে গেছে। বর্তমানে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে বিচারিক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে থাকায় ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে চরম হতাশায় দিন কাটছে স্বজনদের।
আর্তনাদ থামেনি ফেলানীর পরিবারে
ফেলানীর মা জাহানারা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, "প্রতি বছর ৭ জানুয়ারি এলেই বুকটা ফেটে যায়। অমিয় ঘোষের ফাঁসি হলে অন্তত আমার মেয়ের আত্মা শান্তি পেত। আমরা তো আর কিছু চাই না, শুধু দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।"
ফেলানীর বাবা নুর ইসলাম আক্ষেপের সুরে বলেন, "১৫ বছর হয়ে গেল, তবুও কি বিচার পাব না? ভারতের আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছি, রিট করেছি, তবুও বছরের পর বছর শুধু অপেক্ষা আর অপেক্ষা। আমাদের এই দীর্ঘশ্বাসের কি কোনো দাম নেই?"
সীমান্ত হত্যা বন্ধে দৃষ্টান্ত হতে পারে এই বিচার
আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ফেলানী হত্যার বিচার কেবল একটি পরিবারের ব্যক্তিগত লড়াই নয়, বরং এটি সীমান্ত হত্যার (Border Killing) বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী যুদ্ধ। কুড়িগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফখরুল ইসলাম বলেন, "ফেলানী হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত হলে বিএসএফ সদস্যরা সীমান্তে নির্বিচারে গুলি চালানোর আগে ১০ বার ভাবত। এই বিচার সম্পন্ন হলে সীমান্তে মানবাধিকার (Human Rights) পরিস্থিতি উন্নত হতো এবং দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক বড় অন্তরায় দূর হতো।"
ঢাকায় ‘আধিপত্যবিরোধী মার্চ’ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
ফেলানী হত্যার ১৫ বছর উপলক্ষে বিচারহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাজধানীর গুলশানে ‘ফেলানী অ্যাভিনিউয়ে’ আজ ‘আধিপত্যবিরোধী মার্চ’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (NCP) ঢাকা মহানগর উত্তর শাখা। এই কর্মসূচিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। তরুণ প্রজন্ম এবং রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ফেলানী হত্যার বিচারকে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং মানবাধিকার রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখছে।
সীমান্তের কাঁটাতারে ঝুলে থাকা সেই কিশোরীর ছবি আজও দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে থাকা পিটিশনটি কি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখবে? নাকি ফেলানীর বিচারহীনতার ক্ষোভ আরও এক দশক বয়ে বেড়াতে হবে তার পরিবারকে? উত্তরটা লুকিয়ে আছে ভারতের বিচারিক সদিচ্ছা আর দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির টেবিলে।