ফুটবল মাঠের সবুজ ঘাসে তিনি যখন বল পায়ে দৌড়ান, তখন গোটা বিশ্ব বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। রেকর্ড আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী লিওনেল মেসিকে চেনেন না, এমন মানুষ পৃথিবীতে বিরল। কিন্তু ক্যামেরার ফ্ল্যাশলাইট আর গ্যালারির গর্জন ছাপিয়ে যে ‘ব্যক্তিগত মেসি’ রয়েছেন, তাকে কজন চেনে? সম্প্রতি এক দীর্ঘ ও প্রাণবন্ত সাক্ষাৎকারে নিজের জীবনের সেই অন্দরমহলের গল্প শুনিয়েছেন এলএম১০। যেখানে তিনি নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন— মাঠের বাইরে তিনি আদতে এক ‘ভীষণ অদ্ভুত’ মানুষ।
নিভৃতচারী মেসি ও তিন সন্তানের ‘বিশৃঙ্খলা’
ইন্টার মায়ামির এই আইকন (Icon) জানান, মাঠের বাইরের জীবনে তিনি শান্ত ও একা থাকতেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। লুজু-র সাথে আলাপকালে মেসি বলেন, “আমার এমন একটা দিক আছে যা হয়তো অনেকেই জানেন না। আমি একাকীত্ব খুব উপভোগ করি এবং সেখানেই সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পাই।” তবে তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেও এবং সিরোর উপস্থিতিতে বাড়িতে যে প্রাণচঞ্চল পরিবেশ তৈরি হয়, তা সামলানো মাঝে মাঝে তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। মেসির ভাষায়, “বাড়িতে যখন তিন বাচ্চা চারদিকে দৌড়াদৌড়ি করে, সেই বিশৃঙ্খলা মাঝে মাঝে আমাকে মানসিকভাবে বেশ চাপে (Stress) ফেলে দেয়।”
শৃঙ্খলার বাতিক ও অদ্ভুত ‘অবসেশন’
নিজের দৈনন্দিন রুটিন (Daily Routine) এবং ঘরোয়া স্বভাব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মেসি তার অতি-শৃঙ্খলাপরায়ণ দিকের কথা তুলে ধরেন। তিনি স্বীকার করেন যে, কোনো কাজ অগোছালো থাকাটা তিনি সহ্য করতে পারেন না। নিজের জামাকাপড় পর্যন্ত তিনি রঙের বিন্যাস অনুযায়ী সাজিয়ে রাখেন। শুধু তাই নয়, ম্যাচের আগের দিনই তিনি পরবর্তী দিনের সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে রাখেন যাতে শেষ মুহূর্তে কোনো বিভ্রান্তি না ঘটে।
মেসি বলেন, “আমি খুবই গুছানো একজন মানুষ। ধরুন দিনটা আমি একভাবে পরিকল্পনা করেছি, কিন্তু হুট করে সেখানে অপ্রত্যাশিত কোনো বদল এল— এটা আমাকে দারুণভাবে অস্থির করে তোলে।” মজার বিষয় হলো, মেসির এই ‘পারফেকশনিস্ট’ হওয়ার গুণটি বড় ছেলে থিয়াগোর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে।
নিভৃতচারী মেসি ও তিন সন্তানের ‘বিশৃঙ্খলা’
শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্য যে, পৃথিবীর সেরা ফুটবলারের বাড়িতেই বল নিয়ে খেলাধুলা করার ক্ষেত্রে কড়া নিয়ম জারি রয়েছে। আর এই শাসনের মূল কারিগর মেসির স্ত্রী আন্তোনেলা রকুজ্জো। মেসি হাসতে হাসতে জানান, বাড়িতে সব সময় বল থাকলেও অবাধে খেলার অনুমতি নেই। তিনি বলেন, “আমরা তো সারাদিন বল নিয়েই থাকি, কিন্তু ঘরের ভেতরে বেশি খেললে সব অগোছালো হয়ে যায়। তাই আন্তোনেলা বাড়ির ভেতর বল খেলার ওপর এক প্রকার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। তবে কখনও কখনও আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে ‘ওয়ান-অন-ওয়ান’ (One-on-one) খেলি, যা বেশ পাগলাটে হয়।”
আন্তোনেলার সঙ্গে রসায়ন: ভালোবাসা ও মান-অভিমান
স্ত্রী আন্তোনেলার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের সমীকরণ নিয়েও কথা বলেছেন মেসি। শৈশবের প্রেমিকা আন্তোনেলার প্রতি তিনি ভীষণ যত্নশীল হলেও নিজের আবেগ প্রকাশে (Emotional Expression) তিনি কিছুটা রক্ষণশীল। মেসি জানান, তিনি খুব বেশি রোমান্টিক বা আবেগপ্রবণ নন, বরং আন্তোনেলা তার চেয়ে অনেক বেশি ইমোশনাল।
মেসির ভাষায়, “আমি প্রিয়জনদের খুশি দেখতে ভালোবাসি। ছোট ছোট উপহার দিতে পছন্দ করি। কিন্তু আমার ঠান্ডা মেজাজ বা চুপচাপ স্বভাবের কারণে আন্তোনেলা মাঝেমধ্যে অভিযোগ করে। সে মনে করে আগের মতো আমি হয়তো আর আবেগ প্রকাশ করি না। এটা নিয়ে আমাদের মধ্যে কখনও কখনও খুনসুটি আর তর্কও হয়।”
উপসংহার
মাঠের বাইরে লিওনেল মেসি এক সাধারণ বাবা এবং অতি সাধারণ স্বামী, যিনি নিজের ছোট জগতটুকু গুছিয়ে রাখতে ভালোবাসেন। তার এই ‘অদ্ভুত’ স্বভাবগুলোই প্রমাণ করে যে, বিশ্ব ফুটবলের মহাতারকা হয়েও তিনি মাটির কাছাকাছি থাকা একজন মানুষ। ফুটবল ক্যারিয়ারের গোধূলি বেলায় এসে মেসির এই ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি তার ভক্তদের কাছে তাকে আরও আপন করে তুলেছে।