ভেনেজুয়েলার নাটকীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবার দেশটির বিশাল খনিজ সম্পদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার (৭ জানুয়ারি) এক ঘোষণায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা থেকে ৩ থেকে ৫ কোটি (৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন) ব্যারেল অনুমোদিত তেল যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তর করা হবে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে এই পদক্ষেপকে বিশ্ব ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) এবং জ্বালানি বাজারের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের বড় ঘোষণা
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ (Truth Social) দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, ভেনেজুয়েলার এই বিশাল পরিমাণ তেল ‘মার্কেট ভ্যালু’ বা বাজারমূল্যে বিক্রি করা হবে। তবে এই বিক্রয়লব্ধ অর্থের নিয়ন্ত্রণ থাকবে সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে। ট্রাম্পের ভাষায়, এই অর্থ ভেনেজুয়েলা এবং যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হবে এবং এর স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে তিনি নিজেই এর তদারকি করবেন।
তাৎক্ষণিক নির্দেশ জ্বালানি সচিবকে
এই পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য মার্কিন জ্বালানি সচিব (Energy Secretary) ক্রিস রাইটকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন ট্রাম্প। বিশাল আকৃতির স্টোরেজ জাহাজের মাধ্যমে এই তেল পরিবহন করে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের আনলোডিং ডকে নিয়ে আসা হবে। ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ এবং স্থিতিশীলতায় প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেকেই একে ‘জ্বালানি কূটনীতি’ বা এনার্জি ডিপ্লোম্যাসির এক নতুন সমীকরণ হিসেবে দেখছেন।
শিকলবন্দি মাদুরো: ব্রুকলিনের জেলখানায় ভেনেজুয়েলার ‘রাজপরিবার’
ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর এই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে গত শনিবার (৩ জানুয়ারি)। সেদিন এক ঝটিকা ‘স্পেশাল অপারেশন’ (Special Operation) চালিয়ে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করে মার্কিন বাহিনী। বর্তমানে তাদের নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে অবস্থিত ‘মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টার’-এ (Metropolitan Detention Center) রাখা হয়েছে।
মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগ অনুযায়ী, মাদুরো এবং তার স্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক মাদক পাচার এবং অবৈধ অস্ত্র চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত। একই সঙ্গে মাদুরোর পুত্র গুয়েরা, যিনি ভেনেজুয়েলায় ‘রাজপুত্র’ বা ‘নিকোলাসিতো’ নামে পরিচিত, তার বিরুদ্ধেও যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচারের গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
ভেনেজুয়েলা বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম তেলের খনির অধিকারী হলেও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে ভেনেজুয়েলার তেলের বাজার এখন সরাসরি মার্কিন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে চলে এল। প্রশ্ন উঠছে, এই তেল বিক্রির অর্থ সত্যিই ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের হাতে পৌঁছাবে কি না, নাকি এটি কেবল রাজনৈতিক পুনর্বাসনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
মার্কিন প্রশাসনের এই আগ্রাসী অবস্থান ল্যাটিন আমেরিকার রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। মাদুরোর পতন এবং জ্বালানি সম্পদের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণ—এই দুইয়ে মিলে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ এখন কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক মহল।