ভারতের রাজধানী দিল্লির রামলিলা ময়দান সংলগ্ন তুর্কম্যান গেট এলাকায় বুধবার ভোরে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ঐতিহাসিক সৈয়দ ফয়েজ এলাহী মসজিদ ও নিকটস্থ কবরস্থানের পার্শ্ববর্তী অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় অন্তত পাঁচজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশকে কাঁদানে গ্যাসের সেল নিক্ষেপ করতে হয়েছে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এখন পর্যন্ত পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।
উচ্ছেদ অভিযানের প্রেক্ষাপট ও সহিংসতার সূত্রপাত
টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লি হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ মেনে বুধবার (৭ জানুয়ারি) ভোরে দিল্লি পৌর কর্পোরেশন (MCD) এই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। মসজিদ ও কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বমুক্ত করতে ভারী যন্ত্রপাতি ও বুলডোজার নিয়ে হাজির হন পুরকর্মীরা। কিন্তু অভিযান শুরু হতেই স্থানীয়দের একাংশের বাধার মুখে পড়ে প্রশাসন।
দিল্লি পুলিশের ডেপুটি কমিশনার (সেন্ট্রাল) নিধিন ভালসান জানান, বুধবার ভোরে যখন MCD-র বুলডোজারগুলো এলাকায় প্রবেশ করার চেষ্টা করছিল, তখন কিছু দুষ্কৃতকারী নিরাপত্তা বাহিনীকে লক্ষ্য করে পাথর ও কাঁচের বোতল ছুঁড়তে শুরু করে। মুহূর্তের মধ্যে এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে এবং আইনশৃঙ্খলা (Law and Order) বজায় রাখতে পুলিশ টিয়ার শেল ব্যবহার করতে বাধ্য হয়।
তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ
সহিংসতার ঘটনায় পুলিশ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ জনকে আটক করার পাশাপাশি পুরো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ও সিসিটিভি (CCTV) বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ যাচাই করা হচ্ছে যাতে বোঝা যায় এই হামলাটি স্বতঃস্ফূর্ত ছিল নাকি কোনো পূর্ব পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এছাড়া প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান রেকর্ড করার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতি ও উচ্ছেদের পরিধি
দিল্লি পৌর কর্পোরেশনের (MCD) কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, এই অভিযানে মূল মসজিদ কাঠামোর কোনো ক্ষতি করা হয়নি। MCD-র ডেপুটি কমিশনার বিবেক কুমার জানান, হাইকোর্টের আদেশ অনুযায়ী প্রায় ৩৬ হাজার বর্গফুট এলাকা দখলমুক্ত করা হয়েছে। উচ্ছেদকৃত কাঠামোর মধ্যে রয়েছে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার (Diagnostic Center), একটি ওয়েডিং হল, একটি ডিসপেনসারি এবং আদালতের ঘোষিত অবৈধ সীমানা প্রাচীর।
অভিযানটি সফল করতে প্রায় ৩০টি বুলডোজার এবং ৫০টি ডাম্পার ব্যবহার করা হয়। ৩০০-এর বেশি কর্মী ও আধিকারিক সারারাত এই অভিযানে নিয়োজিত ছিলেন। প্রশাসনের দাবি, ‘পরিমিত ও ন্যূনতম বলপ্রয়োগ’ (Minimal Force) করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে।
আইনি জটিলতা ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
এর আগে গত মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) দিল্লি হাইকোর্টে এই উচ্ছেদ অভিযান স্থগিত করার জন্য একটি আবেদন করা হয়েছিল। বিচারপতি অমিত বানসালের এজলাসে মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটি উচ্ছেদ আদেশের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। তবে আদালত উচ্ছেদে স্থগিতাদেশ না দিয়ে নগর উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, MCD এবং দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের (Delhi Waqf Board) কাছ থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব তলব করেছে। আগামী ২২ এপ্রিল এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ নভেম্বর হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ তিন মাসের মধ্যে রামলিলা ময়দান সংলগ্ন প্রায় ৩৯ হাজার বর্গফুট এলাকা দখলমুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছিল। MCD-র দাবি, মসজিদের জন্য বরাদ্দকৃত ০.১৯৫ একর জমির বাইরে অবস্থিত সমস্ত স্থাপনা আইনিভাবে অবৈধ, কারণ মসজিদ কমিটি বা ওয়াকফ বোর্ড ওই অতিরিক্ত জমির মালিকানা সংক্রান্ত কোনো বৈধ নথি (Property Documents) উপস্থাপন করতে পারেনি।
বর্তমানে ওই এলাকায় ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি থমথমে থাকলেও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।