শীত মৌসুমে সুন্দরবন সংলগ্ন খালের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় বন থেকে লোকালয়ে চলে আসে হরিণের পাল। আবার খালে পানি কম থাকায় বন সংলগ্ন এলাকার মানুষ বনে ঢুকে হরিণ শিকারের ফাঁদ পাতে। ৪ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির অন্তর্ভুক্ত বনাঞ্চলে হরিণ শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকা পড়া একটি স্ত্রী বাঘ উদ্ধার করে বন বিভাগ। ‘ট্রানকুইলাইজার গান’ দিয়ে ইনজেকশন পুশ করে অচেতন করে বাঘটিকে ফাঁদ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারের পর বিকেল ৩টার দিকে লোহার খাঁচায় করে বাঘটিকে বন থেকে বের করা হয়। এরপর প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাঘটিকে খুলনায় বন বিভাগের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রেসকিউ সেন্টারে আনা হয়েছে। বাঘটি এখনও খুলনায় চিকিৎসাধীন।
সুন্দরবনের শরকির খালের অদূরে বাঘ আটকে পড়া এলাকা থেকে আরও ছিটকে ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। ৫ জানুয়ারি দিনব্যাপী শরকির খাল থেকে জয়মনি ঠোঁটা পর্যন্ত পায়ে হেঁটে তল্লাশি করে অন্তত আটটি ছিটকে ফাঁদ উদ্ধার করেন বন বিভাগের সদস্যরা। সুন্দরবনের মধ্য থেকে বয়ে চলা খাল।
বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী রক্ষায় অধিকতর সতর্ক থাকার অংশ হিসেবে বন বিভাগ এই তল্লাশি কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর মধ্যে বাঘ আটকে পড়া সুন্দরবনের ওই এলাকা থেকে দুটি এবং নজরুলের ছিলা এলাকা থেকে ছয়টি ছিটকে ফাঁদ উদ্ধার হয়। অনুসন্ধানীতে জানা গেছে, এর আগেও হরিণ শিকারিদের ফাঁদে পড়ে বাঘের পা বা হাত হারানোর ঘটনা ঘটেছে। ২০০৭, ২০০৯ ও ২০১৪ সালের। সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণ শিকারিরা এখনও বেপরোয়া। চোরা শিকারিদের পাশাপাশি এখন বনদস্যুরাও বাঘ এবং হরিণ মেরে এসবের হাড়, মাংস, চামড়া, পুরুষাঙ্গ ও দাঁত বিদেশে পাচার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
হরিণ শিকার নিত্য দিনের ঘটনা হরিণ শিকারের বিষয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বনের পাশে যাদের বাড়ি, তারাই বেশি হরিণ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। তারা বনের মধ্যে ফাঁদ পেতে ও গুলি করে চিত্রা ও মায়া হরিণ শিকার করছে। পরবর্তীতে সুন্দরবন সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় মাংস, মাথা, শিং বিক্রি করে। এভাবে হরিণ শিকার করে বিক্রি করতে গিয়ে অনেকে ধরাও পড়েন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। গত একযুগে এক লাখ চার হাজার ফুট মালা ফাঁদ, অবৈধ ও লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র, স্পিডবোডসহ অসংখ্য নৌ-যান উদ্ধার করা হয়েছে সুন্দরবন থেকে। সর্বশেষ বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরে পূর্ব সুন্দরবনে শিকারিদের পাতা ফাঁদে আটকে পড়া একটি হরিণ জীবিত উদ্ধার করেন বনরক্ষীরা। এ সময় আব্দুল হাকিম (৪০) নামের এক শিকারিকে আটক করা হয়। শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্যকেন্দ্রের ডিমের চর থেকে হরিণটি উদ্ধার ও শিকারিকে আটক করা হয়। পরে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয় হরিণটিকে।
গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর (বুধবার) ও সাতক্ষীরার শ্যামনগরের সুন্দরবনসংলগ্ন গাবুরা ইউনিয়নের লোকালয় থেকে একটি জীবিত হরিণ ও একটি বন্যশূকর উদ্ধার করেছেন স্থানীয়রা। ২৫ ডিসেম্বর একই এলাকার লোকালয় থেকে একটি জীবিত হরিণ উদ্ধার করা হয়েছিল। ২৬ নভেম্বর ভোরে বাগেরহাটের মোংলা থেকে ৩২ কেজি হরিণের মাংস, দুটি মাথা, আটটি পা ও দুই হাজার মিটার হরিণ শিকারের ফাঁদসহ এক হরিণ আক্তার বিশ্বাস (৪০) নামের এক শিকারিকে আটক করা হয়। উপজেলার কানাইনগর এলাকায় পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা যৌথ অভিযান চালিয়ে এই শিকারিকে আটক করে।
অভিযোগ রয়েছে, সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বৈধ বা অবৈধভাবে বনে ঢুকে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে হরিণ শিকার করেন শিকারিরা। বন ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পেশাদার হরিণ শিকারিদের আছে বিশেষ সিন্ডিকেট এবং তাদের সঙ্গে থাকে এজেন্ট ব্যবসায়ীরা। এসব এজেন্টের মাধ্যমে কখনো অগ্রিম অর্ডার আবার কখনো মাংস এনে তারপর বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করা হয়। কোস্টগার্ডসহ বন বিভাগের অভিযানে মাঝেমধ্যে কিছু মাংস ধরা পড়লেও অধিকাংশ শিকারি থেকে যাচ্ছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এক শ্রেণির অসাধু বন কর্মকর্তাদের কারণে সুন্দরবনে হরিণ শিকার কমছে না।