ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে আধিপত্য বিস্তার ও বাল্কহেড মালিক সমিতির কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে অরুয়াইল ইউনিয়ন। বিএনপি ও যুবদল নেতার সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘ ৪ ঘণ্টাব্যাপী চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহত হয়েছেন অন্তত ৫০ জন। শনিবার (১০ জানুয়ারি) দুপুরের এই ঘটনায় পুরো এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, যার প্রভাবে অরুয়াইল বাজারের ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বাধ্য হন।
বিরোধের মূলে বাল্কহেড মালিক সমিতি ও আধিপত্য
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সরাইল উপজেলার অরুয়াইল ইউনিয়নের রানীদিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক বিএনপি নেতা আব্দুল খালেক ওরফে কালা এবং ধামাউড়া গ্রামের বাসিন্দা ইউনিয়ন যুবদলের সদস্য সচিব আব্দুল আজিজের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল 'বাল্কহেড নৌ-পরিবহন মালিক সমবায় সমিতি'র নতুন কমিটি গঠন এবং এলাকায় প্রভাব বিস্তার বা Local Dominance। মূলত কার নেতৃত্বে এই লাভজনক সমিতির নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তা নিয়েই দুই নেতার মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল।
ঘটনার সূত্রপাত ও পাল্টাপাল্টি হামলা
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাতে আধিপত্যের এই লড়াই প্রকাশ্য রূপ নেয়। আব্দুল আজিজের অনুসারীরা আব্দুল খালেক ওরফে কালাকে অতর্কিত মারধর করে। এই ঘটনার জের ধরে শনিবার সকালে আব্দুল খালেকের সমর্থকরা সংগঠিত হয়ে আব্দুল আজিজের ওপর পাল্টা হামলা চালায়। এই পাল্টাপাল্টি মারধরের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে উভয় পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
৪ ঘণ্টার রণক্ষেত্র ও দেশীয় অস্ত্রের মহড়া
শনিবার দুপুর ১টার দিকে রণসজ্জায় সজ্জিত হয়ে উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্র-শস্ত্র (Native Weapons) নিয়ে একে অপরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রানীদিয়া ও ধামাউড়া গ্রামের মধ্যবর্তী এলাকা মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দুপুর ১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত টানা ৪ ঘণ্টা চলে এই ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, পার্শ্ববর্তী অরুয়াইল বাজারের ব্যবসায়ীরা প্রাণভয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দফায় দফায় চলা এই সংঘর্ষে অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন, যাদের স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিকে ও জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হস্তক্ষেপ ও বর্তমান পরিস্থিতি
ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে সরাইল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের চৌধুরী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় বিষয়টি সেনাবাহিনীকেও (Bangladesh Army) তাৎক্ষণিকভাবে অবগত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে পুলিশের একাধিক টিমের ব্যাপক তৎপরতায় বিকেল ৫টার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
ওসি মঞ্জুর কাদের চৌধুরী আরও জানান, "বর্তমানে পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে পুনরায় কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে।" তবে এ ঘটনায় এখনও কোনো পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়নি। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক আধিপত্যের এই রক্তক্ষয়ী লড়াই সরাইলের জনমনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।