আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নজিরবিহীন তৎপরতা শুরু করেছে কুমিল্লা জেলা পুলিশ। গত এক মাসে জেলাজুড়ে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ এবং মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। এই সাঁড়াশি অভিযানে (Mega Drive) এখন পর্যন্ত বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ১ হাজার ৩৮২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি স্থায়ী ও অস্থায়ী চেকপোস্ট।
রেকর্ডসংখ্যক গ্রেফতার ও অপরাধ দমন পরিসংখ্যান
জেলা পুলিশের সরবরাহকৃত তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসজুড়ে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই এক মাসে মোট ১ হাজার ৩৮২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে একটি বড় রেকর্ড। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মাদক মামলায় ১৮৫ জন, ‘ডেভিল হান্ট ফেজ-২’ (Devil Hunt Phase-2) অভিযানে ৪২৬ জন এবং নিয়মিত মামলায় ৭৫০ জন রয়েছেন। এছাড়া দুর্ধর্ষ ডাকাতি মামলায় আটক করা হয়েছে আরও ২১ জনকে। পুলিশের এই নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম মূলত নির্বাচনের আগে জনমনে স্বস্তি ফেরানো এবং সম্ভাব্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধের একটি বড় কৌশল।
অস্ত্র ও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
নির্বাচনকে সামনে রেখে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি রুখতে জিরো টলারেন্স (Zero Tolerance) নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযানে উদ্ধার হয়েছে বিদেশি ও দেশি পিস্তল, এলজি, পাইপগান এবং শটগানসহ ভয়াবহ সব আগ্নেয়াস্ত্র। শুধু আগ্নেয়াস্ত্রই নয়, বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র যেমন—রামদা, কিরিচ, ছুরি ও চাপাতিও জব্দ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে যুবসমাজকে রক্ষায় মাদকের বিরুদ্ধেও বড় জয় পেয়েছে জেলা পুলিশ। জব্দকৃত মাদকের তালিকায় রয়েছে গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, দেশি-বিদেশি মদ এবং বিপুল পরিমাণ ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট। মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত ৫টি বড় যানবাহনও পুলিশের জিম্মায় নেওয়া হয়েছে।
লুণ্ঠিত সম্পদ উদ্ধার ও চেকপোস্ট কার্যক্রম
কুমিল্লা শহরের জননিরাপত্তা ও চুরি-ছিনতাই রোধে ২০টি কৌশলগত চেকপোস্ট (Checkpost) স্থাপন করা হয়েছে। এসব পয়েন্টে দিন-রাত সন্দেহভাজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও তল্লাশি চালানো হচ্ছে। শুধু অস্ত্র বা মাদক নয়, পুলিশি অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ডাকাতি হওয়া ৫.৫ ভরি স্বর্ণ এবং পার্শ্ববর্তী ফেনী জেলা থেকে লুণ্ঠিত হওয়া ৮টি গরু। অপরাধীদের ব্যবহৃত ৪টি পিকআপ ও ১টি মিনি ট্রাকও জব্দ করা হয়েছে, যা অপরাধী চক্রের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপারের কঠোর বার্তা
কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এই অভিযান সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানান, “নির্বাচন ঘিরে আমরা একটি নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় (Security Blanket) তৈরি করছি। অপরাধী যেই হোক এবং তার পরিচয় যাই হোক না কেন, কাউকেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। বিশেষ করে কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী এবং মাদক কারবারিদের দমনে আমাদের গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।” তিনি আরও যোগ করেন যে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে চেকপোস্টের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা হবে।
কুমিল্লা জেলা পুলিশের এই ব্যাপক কার্যক্রম আসন্ন নির্বাচনে একটি সুষ্ঠু ও ভীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করবে বলে সাধারণ নগরবাসী আশা প্রকাশ করছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের আগ পর্যন্ত এই ধরণের বিশেষ অভিযান ও টহল কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।