কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্যগুদামে এক চাঞ্চল্যকর অভিযানে সরকারি ধান ও চালের মজুতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রোববার (১১ জানুয়ারি) জেলা শহরের নতুন রেল স্টেশন এলাকায় অবস্থিত খাদ্যগুদামে দিনভর অভিযান চালিয়ে দেখা গেছে, রেকর্ডপত্র অনুযায়ী যে পরিমাণ খাদ্যশস্য মজুত থাকার কথা, বাস্তবে তার চেয়ে ৫৫৬ মেট্রিক টন ধান ও চাল কম রয়েছে। অর্থাৎ, বিপুল পরিমাণ এই সরকারি সম্পদ গুদাম থেকে রহস্যজনকভাবে ‘উধাও’ হয়ে গেছে।
অভিযানের নেপথ্যে: গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঝটিকা হানা
দুদক সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্যগুদামে প্রকৃত কৃষকদের পরিবর্তে মধ্যস্বত্বভোগী বা ‘Middlemen’ এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে—এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এছাড়া নতুন বস্তার পরিবর্তে পুরাতন ও জরাজীর্ণ বস্তা ব্যবহার এবং সরকারি গুদামের উন্নতমানের চাল বাইরে ‘Black Market’-এ বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকের প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে এই ‘Surprise Raid’ পরিচালনা করা হয়।
গুদামে যা মিলল: হদিস নেই ৫২১ টন ধানের
জেলা দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক মো. সাবদারুর ইসলামের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল গুদামের আটটি আলাদা ‘Warehouse’ পরিদর্শন করেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই ‘Physical Verification’ শেষে দেখা যায়, মজুত তালিকা থেকে ৫২১ মেট্রিক টন ধান এবং ৩৫ মেট্রিক টন চালের কোনো হদিস নেই। এই বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্যের বর্তমান ‘Market Value’ বা বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। এছাড়া গুদামে মজুত থাকা চালের একটি বড় অংশ মানুষের খাওয়ার অনুপযোগী বা ‘Low Quality’ বলেও দুদকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
কর্মকর্তাদের নীরবতা ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ
অভিযান চলাকালীন এই বিশাল ‘Stock Gap’ বা মজুত ঘাটতির বিষয়ে খাদ্যগুদামের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলেও তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দুদকের কর্মকর্তারা অভিযুক্ত গুদামগুলো ‘Seal’ বা সিলগালা করে দিয়েছেন। অভিযানের সময় জেলা খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তদন্তের পরবর্তী ধাপ: আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি
দুদক কর্মকর্তা সাবদারুর ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, “সরকারি গুদামের মালামাল এভাবে উধাও হওয়া কেবল প্রশাসনিক অবহেলা নয়, এটি একটি সুসংগঠিত ‘Financial Crime’। আমরা প্রাথমিক তদন্তে মজুত ঘাটতি ও অখাদ্য চালের উপস্থিতি পেয়েছি। এই দুর্নীতির সাথে ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তার যোগসাজশ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা (Legal Action) গ্রহণ করা হবে।”
খাদ্য নিরাপত্তা (Food Security) নিশ্চিত করতে সরকারের নেওয়া ‘Procurement’ বা সংগ্রহ অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এই ঘটনায় কুড়িগ্রামের সাধারণ কৃষক ও সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃত কৃষকরা যাতে তাদের ন্যায্য পাওনা পান এবং সরকারি সম্পদ যাতে ব্যক্তিস্বার্থে পাচার না হয়, সে বিষয়ে কঠোর মনিটরিংয়ের দাবি উঠেছে।