বাংলাদেশের সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী তৌফিকা করিমের বিরুদ্ধে প্রায় ২৫ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে মানিলন্ডারিং মামলা দায়ের করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রোববার (১১ জানুয়ারি) সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ (সংশোধিত ২০১৫)-এর আওতায় এই নিয়মিত মামলাটি রুজু করে।
মামলায় আনিসুল হক ও তৌফিকা করিম ছাড়াও মো. রাশেদুল কাওসার ভুঞা জীবন এবং মো. কামরুজ্জামান নামে আরও দুজনকে আসামি করা হয়েছে। সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক সুসংগঠিত অপরাধ চক্রের (Organized Crime Syndicate) তথ্য, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অংকের অবৈধ অর্থ আদায় করে আসছিল।
ব্যাংক ও ল’ ফার্মের আড়ালে অর্থপাচার
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) জসীম উদ্দিন খান জানান, এই চক্রটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে আর্থিক অপরাধ পরিচালনা করত। অনুসন্ধানে দেখা যায়, মো. কামরুজ্জামান ২০১৫ সালে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান (National Bank of Pakistan)-এর গুলশান শাখায় ম্যানেজিং ডিরেক্টর (MD) হিসেবে যোগদানের পর থেকেই তৌফিকা করিমের ল’ ফার্ম ‘সিরাজুল হক অ্যাসোসিয়েটস’-এর সঙ্গে নামমাত্র আইনি পরামর্শ চুক্তিতে (Legal Consultancy Contract) আবদ্ধ হন।
এই চুক্তির আড়ালে কোনো কাজ ছাড়াই তৌফিকা করিমের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত মোটা অংকের অর্থ স্থানান্তর করা হতো। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আত্মগোপনে যাওয়ার আগ পর্যন্ত শুধুমাত্র এই ব্যাংক থেকেই চক্রটি ১০ কোটি ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সরাসরি তৌফিকা করিমের অ্যাকাউন্টে আরও ১০ কোটি ৬০ লাখ টাকা জমা হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
এনজিও যখন চাঁদাবাজির হাতিয়ার
সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক মন্ত্রী থাকাকালীন তার প্রভাব খাটিয়ে ‘লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্স টু হেল্পলেস প্রিজোনার অ্যান্ড পারসন্স’ নামে একটি এনজিও (NGO) প্রতিষ্ঠা করেন। কাগজে-কলমে এটি অসহায় কয়েদিদের আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে এটি ব্যবহৃত হতো চাঁদাবাজির মাধ্যম হিসেবে। এই এনজিওর চেয়ারম্যান ছিলেন তৌফিকা করিম, সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন আনিসুল হকের ব্যক্তিগত সহকারী (PS) মো. রাশেদুল কাওসার ভুঞা জীবন এবং স্বয়ং আনিসুল হক ছিলেন এর ট্রেজারার।
সোনালী ব্যাংক পিএলসি-এর সুপ্রিম কোর্ট শাখায় পরিচালিত এই এনজিওর হিসাবের মাধ্যমে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত সর্বমোট ২৪ কোটি ৫৩ লাখ ৬৯ হাজার ২১ টাকা চাঁদা আদায় করা হয়েছে। সিআইডির দাবি, ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে এই এনজিওতে অর্থ দিতে বাধ্য করা হতো।
ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ ও সিআইডির কঠোর অবস্থান
তদন্ত চলাকালীন আদালত ও সিআইডির বিশেষ নির্দেশনায় তৌফিকা করিমের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা মোট ২৬টি ব্যাংক হিসাব (Bank Account) ফ্রিজ করা হয়েছে। এই অ্যাকাউন্টগুলোতে থাকা প্রায় ২৪ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বর্তমানে অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট জানিয়েছে, এই মামলার তদন্ত এখনও চলমান। অপরাধ চক্রের অন্য অজ্ঞাত সদস্যদের শনাক্ত করতে এবং পাচারকৃত অর্থের গন্তব্য খুঁজে বের করতে ডিজিটাল ফরেনসিক ও আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণ (Financial Data Analysis) করা হচ্ছে। সংস্থাটি স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, দেশের আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং অর্থপাচার (Money Laundering) রোধে জড়িতদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।
সাবেক মন্ত্রীর মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তির বিরুদ্ধে এই ধরনের গুরুতর আর্থিক অপরাধের মামলা বাংলাদেশের করপোরেট ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।