গত নভেম্বরের সেই ঘন কুয়াশা আর হতাশার ধোঁয়া এখন আর অ্যানফিল্ডের আকাশে নেই। বরং এফএ কাপের (FA Cup) তৃতীয় রাউন্ডে বার্নসলির মুখোমুখি হওয়ার আগে লিভারপুল শিবিরে বইছে স্বস্তির হাওয়া। কোচ আর্নে স্লটের অধীনে অলরেডরা যেন তাদের সেই হারিয়ে যাওয়া রাজকীয় ছন্দ খুঁজে পেয়েছে। আজ জয় পেলেই সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ১১ ম্যাচ অপরাজিত থাকার এক অনন্য নজির গড়বে প্রিমিয়ার লিগের (Premier League) বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। বিশেষ করে সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে এমিরেটসে আর্সেনালের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র সেই আত্মবিশ্বাসকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে লিভারপুলের এই বদলে যাওয়ার গল্পের সবচেয়ে বড় চমকটি লুকিয়ে আছে দলের সেরা তারকা মোহাম্মদ সালাহর অনুপস্থিতিতে।
সালাহ নেই, তবুও অপ্রতিরোধ্য লিভারপুল
গ্রীষ্মকালীন দলবদলে আসা নতুন মুখগুলো যতটা না নজর কেড়েছে, তার চেয়েও বেশি ফুটবল বিশ্বকে অবাক করেছে সালাহহীন লিভারপুলের পারফরম্যান্স। ডিসেম্বরের শেষভাগ থেকে আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে (AFCON) মিশরীয় জাতীয় দলের হয়ে ব্যস্ত সালাহ। ২০২৫ সালের শেষভাগে লিভারপুলকে তাদের ইতিহাসের অন্যতম সফল সময় পার করতে হচ্ছে দলের সবচেয়ে বড় আইকনকে ছাড়াই।
অদ্ভুত শোনালেও পরিসংখ্যান বলছে, সালাহ স্পটলাইটের বাইরে যাওয়ার পর থেকেই অলরেডদের ফুটবল হয়ে উঠেছে আরও ধারালো ও গতিশীল। চলতি মৌসুমে সালাহকে ছাড়া খেলা সাতটি প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচের একটিতেও হারেনি লিভারপুল। টটেনহাম, ওয়েস্ট হ্যাম কিংবা উলভসের মতো কঠিন প্রতিপক্ষকে তারা গুঁড়িয়ে দিয়েছে অনায়াসে।
পরিসংখ্যানের গোলকধাঁধা: সালাহ কি তবে বোঝার কারণ?
সালাহর উপস্থিতিতে চলতি মৌসুমে লিভারপুল যে ১৪টি ম্যাচ খেলেছে, তার মধ্যে ছয়টিতেই হারের মুখ দেখতে হয়েছে তাদের। কিন্তু সালাহহীন লিভারপুল যেন অনেক বেশি স্থিতিশীল। এমিরেটসের মাঠে আর্সেনালের সঙ্গে পয়েন্ট ভাগাভাগি করা ছিল একেবারেই অপ্রত্যাশিত, যেখানে সালাহ না থাকা সত্ত্বেও লিভারপুলের আক্রমণভাগ ছিল চোখে পড়ার মতো ক্ষিপ্র।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সালাহ দলে না থাকলে লিভারপুলের ‘গোল হজম’ করার হার কমেছে এবং গোল করার হার বেড়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ম্যাচপ্রতি পয়েন্ট সংগ্রহের (Point per Match) হার বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। লিগ টেবিলের দিকে তাকালে এই পরিবর্তনের প্রভাব আরও স্পষ্ট হয়। মৌসুমের প্রথম ১২ ম্যাচে সালাহ যখন মাঠের প্রতি মিনিটে উপস্থিত ছিলেন, তখন লিভারপুল ছিল টেবিলের ১২ নম্বরে। আর শেষ নয় ম্যাচে সালাহকে প্রায় ছাড়াই অলরেডরা এখন উঠে এসেছে টেবিলের চার নম্বরে (Top 4)।
আর্নে স্লটের নতুন ‘উইনিং ফর্মুলা’
প্রশ্ন উঠতেই পারে, সালাহর অনুপস্থিতিই কি লিভারপুলের এই পুনর্জাগরণের একমাত্র কারণ? ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, কোচ আর্নে স্লটের নতুন কৌশলী ছকই এখানে মূল ভূমিকা পালন করছে। সালাহর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে স্লট এখন ‘কালেক্টিভ অ্যাটাক’ (Collective Attack) বা সম্মিলিত আক্রমণের ওপর জোর দিচ্ছেন। খেলোয়াড়দের দ্রুত পজিশন বদল (Position Swap) এবং দায়িত্ব ভাগাভাগি করার ফলে প্রতিপক্ষ রক্ষণভাগের জন্য অলরেডদের আটকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সালাহ যখন তার আন্তর্জাতিক দায়িত্ব শেষে অ্যানফিল্ডে ফিরবেন, তখন স্লটের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—তিনি কি পুরোনো কাঠামোতে ফিরে যাবেন, নাকি সালাহকে এই নতুন ও সফল ‘উইনিং ফর্মুলা’র (Winning Formula) সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য করবেন? লিভারপুলের আগামী দিনগুলোর সাফল্য হয়তো এই সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।