বলিউডের রুপোলি পর্দায় তাঁর অভিষেক হয়েছিল এক লড়াকু কুস্তিগিরের চরিত্রে। আমির খানের ‘দঙ্গল’ সিনেমায় তাঁর সেই তেজস্বী অভিনয় রাতারাতি তারকা খ্যাতি এনে দিয়েছিল ফতিমা সানা শেখকে। কিন্তু পর্দার সেই শক্তিশালী ফতিমার বাস্তব জীবনটা ছিল দীর্ঘ লড়াইয়ের। সম্প্রতি অভিনেত্রীর জন্মদিনে সামনে এসেছে তাঁর জীবনের এক অন্ধকার ও যন্ত্রণাময় অধ্যায়। একাধিক জটিল রোগের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে কীভাবে তিনি বছরের পর বছর নিজেকে গৃহবন্দি করে রেখেছিলেন, সেই অজানা কাহিনী শুনে শিউরে উঠছেন ভক্তরা।
মৃগী রোগের হানা ও মাঝ আকাশে সেই আতঙ্ক
ফতিমা সানা শেখ যে দীর্ঘকাল ধরে ‘Epilepsy’ বা মৃগী রোগে আক্রান্ত, তা এখন অনেকেরই জানা। তবে এই রোগের কারণে তাঁকে চরম বিব্রতকর ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছে বারবার। অভিনেত্রী নিজেই জানিয়েছিলেন, বিমানে যাতায়াতের সময় মাঝ আকাশেই তিনি ‘Seizure’ বা খিঁচুনির কবলে পড়েছিলেন। সেই সময় সহযাত্রী ও বিমানকর্মীদের সহযোগিতায় বড় বিপদ থেকে রক্ষা পান তিনি। জীবনের এই ঝুঁকি নিয়েই তিনি তাঁর অভিনয় ক্যারিয়ার এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।
খাবারের সঙ্গে ‘টক্সিক’ সম্পর্ক: বুলিমিয়া যখন মরণফাঁদ
কেবল মৃগী নয়, ফতিমার জীবনের অন্যতম বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছিল ‘Bulimia’ (বুলিমিয়া) নামক এক খাদ্যাভ্যাসজনিত ব্যাধি। এই রোগে আক্রান্তরা খাবারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। ফতিমা জানিয়েছেন, এক সময় তিনি প্রচণ্ড ডিপ্রেশন থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৫০০ ক্যালোরির (Calorie Intake) খাবার খেতেন। নিজের অজান্তেই এক অসহ্য ‘Binge Eating’ চক্রে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি।
অভিনেত্রীর ভাষ্যমতে, "খাবারের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা একদম ‘Toxic’ হয়ে গিয়েছিল। আমি শুধু খেয়েই যেতাম, কোনো লাগাম ছিল না। খাওয়ার পর যখন হুঁশ আসত, তখন কেন এত খেলাম তা ভেবে মন খারাপ হয়ে যেত। গ্লানি আর লজ্জায় আমি বাইরের জগত থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলাম।"
কেন বেছে নিয়েছিলেন গৃহবন্দি জীবন?
এই ‘বুলিমিয়া’র কারণেই ফতিমা ঘর থেকে বের হওয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, বাড়ির বাইরে পা রাখলেই কোনো না কোনো অছিলায় তিনি প্রচুর খাবার খেয়ে ফেলছেন। মানুষের সামনে নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় এবং সামাজিক লজ্জা তাঁকে এক প্রকার গৃহবন্দি করে ফেলেছিল। মানসিক স্বাস্থ্যের (Mental Health) ওপর এই রোগের প্রভাব এতটাই তীব্র ছিল যে, অভিনেত্রী দীর্ঘ সময় নিভৃতে দিন কাটিয়েছেন।
বন্ধু সান্যার সেই সতর্কবার্তা ও উত্তরণ
ফতিমার এই শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন প্রথম নজর কাড়ে তাঁর প্রাণের বন্ধু ও ‘দঙ্গল’ সহ-অভিনেত্রী সানিয়া মালহোত্রার। সানিয়াই প্রথম ফতিমাকে বোঝান যে, তিনি ‘বুলিমিয়া’র শিকার এবং তাঁর দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন। শুরুতে এই কথা শুনে ফতিমা কিছুটা লজ্জা পেলেও পরে বুঝতে পারেন যে, সানিয়া সঠিক কথা বলছেন। এরপর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তিনি। নিয়মিত থেরাপি এবং জীবনযাপনে পরিবর্তনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেন এই তারকা।
মানসিক স্বাস্থ্য ও নতুন শপথ
বর্তমানে ফতিমা আগের চেয়ে অনেক বেশি সুস্থ ও সচেতন। তিনি কেবল শারীরিক কসরত নয়, বরং নিজের মানসিক শান্তির দিকেও বিশেষ নজর দিচ্ছেন। খাবারের পরিমাণ কমিয়ে পরিমিত খাদ্যাভ্যাস এবং কঠোর ফিটনেস রুটিন (Fitness Routine) মেনে চলছেন তিনি। বলিউডের এই লড়াকু অভিনেত্রী এখন তাঁর অতীত লড়াইয়ের কথা প্রকাশ্যে বলে অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে চান। তাঁর মতে, শারীরিক অসুস্থতা লুকিয়ে না রেখে তা নিয়ে কথা বলা এবং দ্রুত ‘Recovery’র পথ খোঁজাটাই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তার পরিচয়।