• আন্তর্জাতিক
  • ইতিহাসের কাঠগড়ায় মিয়ানমার: আইসিজেতে রোহিঙ্গা গণহত্যার পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু

ইতিহাসের কাঠগড়ায় মিয়ানমার: আইসিজেতে রোহিঙ্গা গণহত্যার পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু

আন্তর্জাতিক ১ মিনিট পড়া
ইতিহাসের কাঠগড়ায় মিয়ানমার: আইসিজেতে রোহিঙ্গা গণহত্যার পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু

এক দশকের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান; গাম্বিয়ার করা ঐতিহাসিক মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মুখোমুখি মিয়ানমার জান্তা, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা।

হেগ-এর আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) শুরু হয়েছে এক ঐতিহাসিক আইনি লড়াই। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো ভয়াবহ গণহত্যার মামলার পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু করেছে জাতিসংঘের এই সর্বোচ্চ আদালত। সোমবার (১২ জানুয়ারি) থেকে শুরু হওয়া এই আইনি প্রক্রিয়াকে গত এক দশকের মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার দায়ের করা এই মামলাটি কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়, বরং বৈশ্বিক মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত মিয়ানমার: প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বর অভিযানের মুখে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। সে সময়কার নৃশংস হত্যাকাণ্ড, গণধর্ষণ এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাগুলোকে জাতিসংঘ একটি ‘Fact-finding Mission’-এর মাধ্যমে তদন্ত করে এবং একে সরাসরি ‘গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে। ২০১৯ সালে গাম্বিয়া সেই তদন্তের ভিত্তিতে আইসিজেতে মামলা দায়ের করলে দীর্ঘ আইনি জটিলতা পেরিয়ে এখন এটি পূর্ণাঙ্গ শুনানির পর্যায়ে পৌঁছেছে। টানা তিন সপ্তাহ ধরে এই শুনানিতে উভয় পক্ষ তাদের যুক্তি ও তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করবে।

গাজা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই মামলার গুরুত্ব

বিশ্লেষকদের মতে, এই মামলার রায় কেবল মিয়ানমারের জন্য সীমাবদ্ধ থাকবে না। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যার মামলার ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘Legal Precedent’ বা আইনি নজির হিসেবে কাজ করতে পারে। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে কোনো রাষ্ট্রকে এককভাবে জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে এই মামলার ফলাফল সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। ফলে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নজর এখন হেগ-এর এই আদালতের দিকে।

ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর: শরণার্থী শিবিরে আশার আলো দীর্ঘ সময় পর হলেও ন্যায়বিচারের এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় বাংলাদেশের কক্সবাজারের আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে। জাতিসংঘের ‘Independent Investigative Mechanism for Myanmar’-এর প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান জানিয়েছেন, এই শুনানি রোহিঙ্গাদের মনে স্বস্তি দিচ্ছে।

৩৭ বছর বয়সী শরণার্থী জানিফা বেগম, যিনি নিজের চোখে জান্তা বাহিনীর তান্ডব দেখেছেন, তিনি বলেন, "আমরা শুধু ন্যায়বিচার আর শান্তি চাই। জান্তা সেনারা আমাদের নারীদের সম্মান কেড়ে নিয়েছে, পুরুষদের হত্যা করেছে। এই আদালত যেন আমাদের সেই যন্ত্রণার বিচার করে।" একই সুরে কথা বলেন রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী মোহাম্মদ সাইয়েদ উল্লাহ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আদালতের রায় তাদের দীর্ঘদিনের ‘Deep Scars’ বা গভীর ক্ষতের কিছুটা হলেও উপশম ঘটাবে।

গোপন শুনানি ও সাক্ষ্য গ্রহণ

নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে রোহিঙ্গা ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য গ্রহণের প্রক্রিয়াটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে না। এটি প্রথমবারের মতো কোনো আন্তর্জাতিক আদালতে ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি শোনার সুযোগ করে দিচ্ছে। উইমেনস পিস নেটওয়ার্কের প্রধান ওয়াই ওয়াই নু বলেন, "এটি কয়েক দশকের দুর্ভোগ অবসানের একটি সুযোগ। বিশ্বকে নিশ্চিত করতে হবে যেন মিয়ানমারের ‘Impunity’ বা দায়মুক্তির সংস্কৃতি চিরতরে শেষ হয়।"

মিয়ানমারের অবস্থান ও আইনি চ্যালেঞ্জ

শুরু থেকেই মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, ২০১৭ সালের সেই সামরিক অভিযান ছিল স্রেফ একটি ‘Counter-terrorism Operation’, যা কথিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার জবাবে পরিচালিত হয়েছিল। তবে গাম্বিয়ার আইনি দল এই দাবিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে আসছে। ‘Legal Action Worldwide (LAW)’ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, যদি আইসিজে ‘Genocide Convention’-এর আওতায় মিয়ানমারকে দায়ী সাব্যস্ত করে, তবে তা হবে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি গণহত্যার দায়ে দণ্ডিত করার ক্ষেত্রে ইতিহাসের প্রথম ও অন্যতম সফল পদক্ষেপ।

একটি দীর্ঘমেয়াদী আইনি লড়াইয়ের পর এই শুনানির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধারের পথ প্রশস্ত হবে কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার ওপর বিশ্বের কোটি কোটি শান্তিকামী মানুষের আস্থা টিকিয়ে রাখতে এই মামলার রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

Tags: international law justice human rights united nations myanmar genocide refugees icj rohingya gambia