সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুই ভাইসহ ৯৪ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে বড় ধরনের আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চট্টগ্রামের ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের (ইউসিবিএল) চারটি শাখা থেকে সাতটি ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে জালিয়াতি করে ৪৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এই মামলাগুলো দায়ের করা হয়েছে।
রোববার (১২ জানুয়ারি) দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ এই সাতটি পৃথক মামলা রুজু করা হয়। দুদকের জনসংযোগ বিভাগ থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করে অর্থ লোপাটের অভিনব ছক
দুদকের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে এক অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং চাতুর্যপূর্ণ জালিয়াতির চিত্র। অভিযোগ অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বিভিন্ন গ্রামের প্রান্তিক কৃষক, দিনমজুর, দর্জি ও সেলসম্যানদের প্রলোভন দেখিয়ে বা তাদের অজান্তেই ‘বড় ব্যবসায়ী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এরপর এই সাধারণ মানুষদের নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যাংকে ভুয়া হিসাব (Bank Account) খোলা হয়। মূলত এই ‘শেল কোম্পানি’ বা অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের আড়ালে ঋণের আড়ালে ব্যাংকের বিশাল অঙ্কের টাকা সরিয়ে ফেলাই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের একাংশের যোগসাজশে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের (ইউসিবিএল) চারটি শাখা থেকে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ছাড় করা হয়। পরবর্তী সময়ে সেই অর্থ নির্দিষ্ট কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাঙ্কিং খাতের Credit Policy এবং Internal Audit ব্যবস্থার চরম লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে মনে করছে দুদক।
হাইপ্রোফাইল অভিযুক্ত ও প্রভাবের অপব্যবহার
এই মামলার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের দুই সহোদর। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা এই বিশাল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন। অভিযুক্ত ৯৪ জনের তালিকায় তৎকালীন ব্যাংক কর্মকর্তা এবং এই জালিয়াতির সুবিধভোগী বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই মামলাটি দেশের ব্যাংকিং খাতের Financial Crime বা আর্থিক অপরাধ দমনে একটি নজির হয়ে থাকবে।
সিএমপির সাবেক উপকমিশনারের বিরুদ্ধেও দুদকের খড়গ
একই দিনে দুদক আরও একটি চাঞ্চল্যকর মামলা দায়ের করেছে সিএমপির (চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ) কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সাবেক উপকমিশনার (ডিসি) হামিদুল আলম এবং তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে। তাদের বিরুদ্ধে ৬১ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের ঘোষিত আয়ের উৎসের বাইরে এই বিশাল সম্পদ অর্জিত হয়েছে, যা আইনত দণ্ডনীয়।
উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপ
দুদক সূত্রে জানা গেছে, এই মামলাগুলোর তদন্ত প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আত্মসাৎকৃত অর্থের গতিপথ বা Money Trail শনাক্ত করতে কাজ করছে ফরেনসিক টিম। প্রাথমিক এজাহার দাখিলের পর এখন অভিযুক্তদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের (Attachment) প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ব্যক্তি এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুদকের এই কঠোর অবস্থান দেশের সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতিবাজদের কাছে একটি কড়া বার্তা পৌঁছাতে সক্ষম হবে।