মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত ভূ-রাজনীতিতে (Geopolitics) উত্তেজনার পারদ আরও চড়িয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, ওয়াশিংটন যদি তাদের সামরিক সক্ষমতা ‘পরীক্ষা’ করতে চায়, তবে ইরান যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পুরোপুরি প্রস্তুত। সোমবার (১২ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এই কড়া বার্তা দেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি।
ট্রাম্পের হুমকির পাল্টা জবাব
সম্প্রতি ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে তেহরানের কঠোর অবস্থানের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের সেই হুঁশিয়ারির প্রতিক্রিয়ায় আরাঘচি বলেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি মনে করেন সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন, তবে তিনি ভুল করছেন। ওয়াশিংটন যদি আমাদের পরীক্ষা করতে চায়, তবে আমরা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণের জন্য তৈরি।”
উচ্চতর সামরিক প্রস্তুতি ও কৌশলগত অবস্থান
সাক্ষাৎকারে আরাঘচি দাবি করেন, গত বছরের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে ইরানের সামরিক প্রস্তুতি (Military Readiness) অনেক বেশি শক্তিশালী এবং ব্যাপক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান অস্থিরতার মধ্যেও আমেরিকার সাথে যোগাযোগের কূটনৈতিক পথ (Diplomatic Channels) খোলা রাখা হয়েছে, তবে তার দেশ ‘সকল বিকল্প’ বা All Options-এর জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “যদি ওয়াশিংটন অতীতে ব্যর্থ হওয়া কোনো সামরিক বিকল্প আবারও পরীক্ষা করতে চায়, তবে ইরান তার যোগ্য জবাব দেবে।” তবে একই সাথে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, মার্কিন প্রশাসন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের পরিবর্তে বুদ্ধিমত্তার সাথে সংলাপের পথই বেছে নেবে।
বিক্ষোভ ও বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
ইরানে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের মূলে ছিল আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি (Inflation) ও জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয়বৃদ্ধি। তবে সময়ের সাথে সাথে এই বিক্ষোভ সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। তেহরানের দাবি, এই অস্থিরতা স্বাভাবিক কোনো জনরোষ নয়, বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সুপরিকল্পিতভাবে দেশে অরাজকতা উসকে দিচ্ছে।
আরাঘচি সতর্ক করে বলেন, যারা ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষার জন্য ওয়াশিংটনকে একটি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে, তাদের বিষয়ে মার্কিন প্রশাসনের সতর্ক হওয়া উচিত।
পারমাণবিক কর্মসূচি ও ট্রাম্পের ‘স্ট্রং অপশন’
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি (Nuclear Program) নিয়ে আলোচনার জন্য একটি বৈঠকের প্রস্তুতি চললেও, ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অনমনীয় মনোভাব সেই প্রক্রিয়াকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, তেহরানের ওপর ‘শক্তিশালী বিকল্প’ (Strong Option) ব্যবহারের বিষয়টি তাঁর টেবিলে রয়েছে। ট্রাম্পের মতে, ইরানি বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চলতে থাকলে যুক্তরাষ্ট্র বসে থাকবে না।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হোয়াইট হাউসের এই আক্রমণাত্মক মনোভাব এবং তেহরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে চলছে কূটনৈতিক দাবার চাল, অন্যদিকে সীমান্তে বাড়ছে সমরাস্ত্রের ঝনঝনানি। আন্তর্জাতিক মহল এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে যে, এই বাকযুদ্ধ শেষ পর্যন্ত বড় কোনো সামরিক সংঘাতের (Military Conflict) রূপ নেয় কি না।