বিশ্ব নারী ক্রিকেটের এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান হতে চলেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর ঘোষণা দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়া নারী দলের কিংবদন্তি অধিনায়ক ও উইকেটরক্ষক-ব্যাটার অ্যালিসা হিলি। আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চে ঘরের মাঠে ভারতের বিপক্ষে পূর্ণাঙ্গ সিরিজের পরই পেশাদার ক্রিকেটের আঙিনা থেকে চিরতরে সরে দাঁড়াবেন তিনি। ২০১০ সালে অভিষেক হওয়া এই অজি তারকা ১৫ বছরের দীর্ঘ পথচলায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার হিসেবে।
ক্লান্তি ও ফুরিয়ে আসা প্রেরণা: কেন এই বিদায়?
সম্প্রতি 'উইলো টক' (Willow Talk) নামক একটি পডকাস্টে নিজের অবসরের কারণ ব্যাখ্যা করেন হিলি। তিনি জানান, সিদ্ধান্তটি হুট করে নেওয়া নয় বরং দীর্ঘদিনের ভাবনার ফসল। হিলির ভাষ্যমতে, "গত কয়েক বছর ধরে আমি শারীরিক ক্লান্তি ছাপিয়ে মানসিক ক্লান্তিতে বেশি ভুগছিলাম। ইনজুরি তো ছিলই, তবে মনের ভেতর থেকে যে শক্তিটা আসত, সেটা ধীরে ধীরে ফুরিয়ে যাচ্ছিল। বারবার নতুন করে নিজেকে উজ্জীবিত করা আমার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছিল।"
নিজের মানসিক পরিবর্তনের এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করে তিনি বলেন, "গত বছরের ওমেন্স বিগ ব্যাশ লিগ (WBBL) চলাকালীন একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হলো—আজও তো সেই ক্রিকেটের সাধারণ এক দিন। তখনই আমি অবাক হয়েছিলাম, কারণ আমি খেলাটাকে ভীষণ ভালোবাসতাম। জেতার আকাঙ্ক্ষাটা ফুরিয়ে না গেলেও আগের মতো তীব্রতা পাচ্ছিলাম না।"
পরিসংখ্যান ও বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের খতিয়ান
২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাত্র ১৯ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে (International Debut) পা রাখা হিলি অস্ট্রেলিয়াকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। তাঁর ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান যেকোনো ক্রিকেটারের জন্য ঈর্ষণীয়।
ওয়ানডে ক্রিকেট: সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি রান।
টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট: ৩ হাজার ৫৪ রান।
বিশ্ব রেকর্ড: পূর্ণ সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তাঁর ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ অপরাজিত ১৪৮* রানের ইনিংসটি এখনও বিশ্ব রেকর্ডের পাতায় উজ্জ্বল।
ক্যাপ্টেন হিলির শোকেসে রয়েছে মোট ৮টি বিশ্বকাপ শিরোপা (৬টি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ২টি ওয়ানডে বিশ্বকাপ)। ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ ও ২০১৯ সালে টানা দুইবার 'আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বর্ষসেরা ক্রিকেটার' নির্বাচিত হন তিনি।
বিদায়ী সিরিজের রূপরেখা
ভারতের বিপক্ষে আসন্ন সিরিজের মাধ্যমেই হবে তাঁর 'ফেয়ারওয়েল'। তবে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে তাকে আর দেখা যাবে না। ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে অংশ নেওয়ার পর ক্রিকেটকে চূড়ান্ত বিদায় জানাবেন টেস্টের সাদা পোশাকে। আগামী ৬ থেকে ৯ মার্চ পার্থের ঐতিহাসিক ওয়াকা (WACA) স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে দিবা-রাত্রির টেস্ট (Day-Night Test) ম্যাচটিই হবে হিলির ক্যারিয়ারের ১১তম এবং শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটে নতুন যুগের অপেক্ষা
অ্যালিসা হিলির অবসরের ফলে ২০২৬ নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে নতুন নেতৃত্ব খুঁজতে হবে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়াকে। মিচেল স্টার্কের জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পরিচিত হলেও হিলি নিজের যোগ্যতায় ক্রিকেটের এক অনন্য আইকন হয়ে উঠেছেন। তাঁর প্রস্থান কেবল অস্ট্রেলিয়ার জন্য নয়, বরং বিশ্ব ক্রিকেটের জন্যই এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করবে। হিলির এই প্রস্থান এক সফল প্রজন্মের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দিলো, যারা দেড় দশক ধরে নারী ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছিল।