বাংলাদেশের ভূখণ্ডগত সীমাবদ্ধতা ছাপিয়ে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশিকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন ‘গ্রোথ ইঞ্জিন’ (Growth Engine) হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। সমুদ্র অর্থনীতির সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে মৎস্য সম্পদ ও এনার্জি সেক্টরে যে অপার সম্ভাবনা রয়েছে, তার সঠিক বাস্তবায়নে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা বা রোডম্যাপ (Roadmap) দিয়ে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বিডা চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে বিডা আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন চাবিকাঠি: ব্লু ইকোনমি
সংলাপে বিডা চেয়ারম্যান অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ এখনো সমুদ্রকে তার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের মূল উৎস হিসেবে পুরোপুরি মূল্যায়ন করতে পারেনি। তিনি বলেন, “আমরা ভূমির উন্নয়নে যতটা মনোযোগী, সমুদ্র নিয়ে তার ১০ শতাংশ পরিকল্পনা থাকলেও আমাদের অর্থনীতিতে বিশাল প্রবৃদ্ধি (Economic Growth) আসা সম্ভব। সমুদ্র কেবল জলসীমা নয়, এটি মৎস্য সম্পদ, খনিজ ও জ্বালানির এক বিশাল ভাণ্ডার।”
তিনি আরও জানান, উপসাগরীয় অঞ্চলে জনজীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরিবেশগত উন্নয়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কীভাবে দায়িত্বশীলভাবে সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবহার করা যায়, সে ব্যাপারে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
আঞ্চলিক সহযোগিতা ও ভারত মহাসাগরীয় গুরুত্ব
‘উত্তর-পূর্ব ভারত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক সংলাপ’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে জাপান, মালদ্বীপসহ ক্ষুদ্র দ্বীপ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর (SIDS) প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সংলাপে উঠে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বর্তমানে ৩৩টি জাতির অন্তত ২.৯ মিলিয়ন মানুষ সরাসরি সমুদ্রের ওপর নির্ভরশীল। আলোচকদের মতে, টেকসই ‘নীল অর্থনীতি’ বা Blue Economy-র মাধ্যমেই কেবল এই অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিডা চেয়ারম্যানের মতে, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) এবং অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে সামুদ্রিক শাসনে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে ডাটা ড্রিভেন (Data-driven) নীতিমালার মাধ্যমে সমুদ্র সম্পদ আহরণ করলে তা দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা (Climate Resilience) তৈরিতে সহায়ক হবে।
মাতারবাড়ি ও মহেশখালী: আগামীর অর্থনৈতিক করিডোর
সংলাপে মহেশখালী-মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দরের (Deep Sea Port) কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব নিয়ে বিশেষ আলোচনা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই বন্দরটি চালু হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের একটি ‘হাব’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। মাতারবাড়ি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের যে নতুন দ্বার উন্মোচিত হচ্ছে, তাকে ব্লু ইকোনমির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দেখছে বিডা।
বিনিয়োগের সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি এবং সামুদ্রিক সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিডা যে রূপরেখা তৈরি করছে, তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জিডিপিতে (GDP) উল্লেখ্যযোগ্য অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন মনে করেন, এই রূপরেখা পরবর্তী সরকারের জন্য সমুদ্র জয়ের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।