দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস রফতানি খাতে মন্দার মেঘ কাটছেই না। টানা সপ্তম মাসের মতো পতনের বৃত্তে বন্দি হয়ে আছে বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য। সবশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেও রফতানি আয়ে বড় অংকের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয়ের চ্যালেঞ্জের মুখে রফতানি আয় বছর ব্যবধানে ১২ শতাংশের বেশি কমে গেছে।
সাত মাসের টানা পতন ও ফেব্রুয়ারির চিত্র রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলাদেশ থেকে পণ্য রফতানি করে আয় হয়েছে ৩৪৯ কোটি ৫২ লাখ মার্কিন ডলার (US Dollar)। ২০২৪ সালের একই সময়ে অর্থাৎ গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই আয়ের পরিমাণ ছিল ৩৯৭ কোটি ৩১ লাখ ডলার। এক বছরের ব্যবধানে রফতানি আয় কমেছে ৪৭ কোটি ৭৯ লাখ ডলার, যা শতাংশের হিসেবে ১২.০৩ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি (Negative Growth)।
গত কয়েক মাস ধরেই রফতানি খাতের এই ধারাবাহিক পতন নীতিনির্ধারক ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। টানা সাত মাস ধরে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়া এবং ধারাবাহিক নিম্নমুখী প্রবণতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের (Forex Reserve) ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রফতানি খাতে কেন এই স্থবিরতা? বাজার বিশ্লেষকদের মতে, রফতানি আয়ে এই দীর্ঘমেয়াদী পতনের পেছনে বেশ কিছু বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ কাজ করছে। প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক খাতের চাহিদা পশ্চিমা দেশগুলোতে কিছুটা হ্রাস পাওয়া এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতির (Inflation) ফলে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া অন্যতম কারণ। এছাড়া, দেশের ভেতরে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। এই 'চেইন রিঅ্যাকশন' সামগ্রিক রফতানি খাতকে (Export Sector) এক ধরনের অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইপিবির পরিসংখ্যান ও ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস ইপিবির ডেটা (Data) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেবল তৈরি পোশাকই নয়, বরং চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং হিমায়িত খাদ্যের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোও আশানুরূপ পারফরম্যান্স দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফেব্রুয়ারির এই ৩৪৯ কোটি ডলারের আয় সাম্প্রতিক সময়ের মাসিক রফতানি আয়ের তুলনায় অনেকটাই কম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রফতানি আয়ে গতি ফেরাতে হলে এখনই বিকল্প বাজার অনুসন্ধান এবং পণ্যের বহুমুখীকরণের (Product Diversification) ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণ এবং লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করা না গেলে এই নেতিবাচক ধারা থেকে বেরিয়ে আসা চ্যালেঞ্জিং হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে রফতানি আয়ের এই ‘রেড সিগন্যাল’ সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার (Macroeconomic Stability) জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।