বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের কালজয়ী সাহিত্যকর্ম ‘সুলতানার স্বপ্ন’ এবার বিশ্বমানের অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের রূপ নিয়ে হাজির হচ্ছে ঢাকার প্রেক্ষাগৃহে। স্প্যানিশ নির্মাতা ইসাবেল হারগুয়েরার পরিচালনায় নির্মিত এই বিশেষ চলচ্চিত্র ‘সুলতানাস ড্রিম’ (Sultana's Dream) আগামী ১৬ জানুয়ারি দেশের জনপ্রিয় মাল্টিপ্লেক্স চেইন স্টার সিনেপ্লেক্সে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। নারী স্বাধীনতার এক অনন্য ‘Feminist Utopia’ বা ল্যাডিল্যান্ডের সেই রোমাঞ্চকর গল্প এবার পর্দায় দেখার অপেক্ষায় দর্শকরা।
বৈশ্বিক মঞ্চে ‘সুলতানাস ড্রিম’-এর জয়জয়কার
৮৬ মিনিটের এই অ্যানিমেশন ফিচার ফিল্মটি (Feature Film) ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। স্প্যানিশ ভাষায় এর মূল শিরোনাম ‘এল সুয়েনো দে লা সুলতানা’ (El sueño de la sultana)। ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর স্পেনের মর্যাদাপূর্ণ ‘সান সেবাস্তিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভালে’ চলচ্চিত্রটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার অনুষ্ঠিত হয়। এরপর এটি ইউরোপিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, হামবুর্গ ফিল্মফেস্ট, লিডস ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং ভারতের গোয়া ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের মতো বড় বড় আসরে প্রদর্শিত ও প্রশংসিত হয়েছে।
দিল্লির এক বৃষ্টির দিনে শুরু হওয়া স্বপ্নের সফর
এই অসাধারণ চলচ্চিত্রটি নির্মাণের নেপথ্যে রয়েছে একটি চমৎকার গল্প। ২০১২ সালে এক প্রবল বৃষ্টির দিনে দিল্লির একটি আর্ট গ্যালারিতে আটকা পড়েছিলেন স্প্যানিশ নির্মাতা ইসাবেল হারগুয়েরা। সেখানেই তার হাতে আসে বেগম রোকেয়ার ‘সুলতানাস ড্রিম’ বইটি। এক সাক্ষাৎকারে হারগুয়েরা বলেন, "বইটি পড়ার পর আমি রীতিমতো বিস্মিত হয়েছিলাম। ১৯০৫ সালে লেখা একটি বইয়ে একজন নারী যে ধরনের পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়েছেন, তা আমাকে প্রথম দেখাতেই প্রেমে ফেলে দিয়েছিল। তখনই স্থির করি, এটি নিয়ে আমি সিনেমা বানাব।" দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তার সেই স্বপ্ন এখন পূর্ণতা পেয়েছে।
একটি ভাষাগত ও শৈল্পিক মেলবন্ধন
এটি ইসাবেল হারগুয়েরার পরিচালিত প্রথম ফিচার ফিল্ম। স্পেন ও জার্মানির পাঁচটি প্রোডাকশন হাউসের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত এই ছবিতে ভাষাগত বৈচিত্র্য অত্যন্ত প্রবল। এতে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, ইতালিয়ান, স্প্যানিশ ও বাস্ক—এই ছয়টি ভাষার সংমিশ্রণ দেখা যাবে। সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন জিয়ানমার্কো। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে এতে থাকছে কলকাতার জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের লেখা একটি গান। তাজদির জুনায়েদের সংগীতায়োজনে গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন দীপান্বিতা আচার্য।
রোকেয়ার বৈপ্লবিক কল্পনা ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
১৯০৫ সালে মূল ইংরেজিতে এবং পরবর্তীতে ১৯২২ সালে বেগম রোকেয়ার নিজের করা বাংলা অনুবাদের এই গল্পটি তৎকালীন ভারতবর্ষে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। যেখানে সমাজ পুরুষতান্ত্রিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল, সেখানে রোকেয়া স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন এমন এক দেশ বা ‘ল্যাডিল্যান্ড’-এর, যেখানে নারীরা জ্ঞান ও প্রযুক্তির মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেন। রোকেয়ার সেই বৈপ্লবিক চিন্তাধারাকে আধুনিক অ্যানিমেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্দায় জীবন্ত করে তুলেছেন ইসাবেল।
স্টার সিনেপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের মতে, এই চলচ্চিত্রটি কেবল বিনোদন নয়, বরং বাঙালি সাহিত্য ও ঐতিহ্যের এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রতীক। আগামী ১৬ জানুয়ারি থেকে দর্শকরা এই ভিজ্যুয়াল মাস্টারপিসটি উপভোগ করতে পারবেন।