• দেশজুড়ে
  • ২৬৭ বছরের টানটান উত্তেজনা: ময়মনসিংহে এক মণ ওজনের ‘হুম গুটি’ নিয়ে হাজারো মানুষের লড়াই

২৬৭ বছরের টানটান উত্তেজনা: ময়মনসিংহে এক মণ ওজনের ‘হুম গুটি’ নিয়ে হাজারো মানুষের লড়াই

দেশজুড়ে ১ মিনিট পড়া
২৬৭ বছরের টানটান উত্তেজনা: ময়মনসিংহে এক মণ ওজনের ‘হুম গুটি’ নিয়ে হাজারো মানুষের লড়াই

জমিদার আমলের সীমানা বিরোধ থেকে কালজয়ী ঐতিহ্যের জন্ম; ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়ায় শেষ পৌষের বিকেলে ‘হুম গুটি’ খেলায় মাতল আবালবৃদ্ধবনিতা।

পৌষের হিমেল বিকেলে তিল ধারণের ঠাঁই নেই ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর বড়ই আটা বন্দ মাঠে। চারদিকে উৎসবের আমেজ, উচ্চস্বরে বাজছে সাউন্ড বক্স। এই জনসমুদ্রের মধ্যমণি পিতলের তৈরি প্রায় এক মণ (৪০ কেজি) ওজনের একটি গোলাকার বল, যার নাম ‘হুম গুটি’। এই বিশেষ স্মারকটির দখল নিতেই চলছে হাজারো মানুষের কাড়াকাড়ি আর পেশিশক্তির লড়াই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই আজব খেলায় কোনো নির্দিষ্ট রেফারি নেই, নেই কোনো ধরাবাঁধা দল কিংবা খেলোয়াড়। উন্মুক্ত এই প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়ার লক্ষ্য কেবল একটাই—গুটিটি নিজের দখলে নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো।

বুধবার (১৪ জানুয়ারি) পৌষ সংক্রান্তির বিকেলে অনুষ্ঠিত হলো এই অঞ্চলের ইতিহাসের সাক্ষী ২৬৭তম ‘হুম গুটি’ খেলা। ব্রিটিশ আমলের জমিদারী শাসন থেকে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য আজও অমলিন।

সীমানা বিরোধ থেকে যেভাবে এই ঐতিহ্যের শুরু

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, এই খেলার প্রেক্ষাপটটি বেশ নাটকীয়। মুক্তাগাছার জমিদার রাজা শশীকান্ত আচার্য চৌধুরীর সাথে ত্রিশালের বৈলরের জমিদার হেম চন্দ্র রায়ের জমির পরিমাপ নিয়ে এক প্রবল বিরোধ সৃষ্টি হয়। তৎকালীন সময়ে জমিদারী ভূখণ্ডে ‘তালুক’ ও ‘পরগনা’—এই দুই অঞ্চলে জমির মাপ ভিন্ন ছিল। তালুকের প্রতি কাঠা ছিল সাড়ে ৯ শতাংশ, আর পরগনার ছিল সাড়ে ৬ শতাংশ।

এই বৈষম্য ও সীমানা নিয়ে সৃষ্ট Conflict Resolution বা বিরোধ মীমাংসার জন্য লক্ষ্মীপুর গ্রামের বড়ই আটা নামক স্থানে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয় এই গুটি খেলার। শর্ত ছিল—বিপুল ওজনের এই গুটি লড়াইয়ের মাধ্যমে যে পক্ষ টেনে নিয়ে যেতে পারবে, তাদের মাপ অনুযায়ী জমির সীমানা নির্ধারিত হবে। সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়ে মুক্তাগাছার জমিদারের প্রজারা জয়ী হন। সেই থেকে তালুক-পরগনার সীমান্তের Zero Point-এ শুরু হওয়া এই খেলা আজও প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষের সমাগমে উদযাপিত হয়।

পেশিশক্তি ও কৌশলের লড়াই

গুটিটি বর্তমানে মন্ডল পরিবারের তত্ত্বাবধানে থাকে। পরিবারের বর্তমান সদস্য আবুবকর সিদ্দিক গুটি নিয়ে মাঠে আসার পরপরই শুরু হয় মূল উন্মাদনা। এই খেলায় গায়ের জোর এবং দলবদ্ধ Strategy বা কৌশলের লড়াই প্রাধান্য পায় বলে স্থানীয়রা একে ‘হুমজিক্যালি’ খেলাও বলে থাকেন। নিয়ম অনুযায়ী, গুটিটি যতক্ষণ না কোনো পক্ষ সফলভাবে লুকিয়ে ফেলতে পারছে বা নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিতে পারছে, ততক্ষণ এই লড়াই চলতে থাকে। ১৯৯৫ সাল থেকে এই খেলার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করছেন আবুবকর সিদ্দিক। তিনি জানান, কয়েকশ বছরের ইতিহাসে এই খেলা নিয়ে বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি, যা সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ।

হুম গুটি ঘিরে গ্রামীণ উৎসবে ‘ছোট ঈদ’

ফুলবাড়ীয়াবাসীর কাছে হুম গুটি খেলা কেবল একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি Cultural Heritage বা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এই দিনটিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রতিটি বাড়িতে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে। উৎসবের গভীরতা এতটাই যে, এই দিনকে কেন্দ্র করে এলাকায় জবাই হয় শতাধিক গরু। দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয়-স্বজনরা বেড়াতে আসেন। শিশুদের পরনে থাকে নতুন পোশাক।

মাঠের এক পাশে বসে বিশাল গ্রামীণ মেলা। মাটির খেলনা থেকে শুরু করে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। আধুনিক বিনোদনের যুগেও শত বছরের পুরনো এই ঐতিহ্য যেভাবে তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করছে, তা নিঃসন্দেহে ময়মনসিংহের লোকজ সংস্কৃতির এক শক্তিশালী দিক। জমিদারী আমল বিলীন হলেও ‘হুম গুটি’ আজও টিকে আছে স্থানীয়দের আত্মপরিচয় এবং আনন্দের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে।

Tags: sports news bangladesh culture hum guti mymensingh tradition fulbaria news traditional sport zamindar history rural festival local heritage winter festival