ক্রিকেটপাড়ায় নজিরবিহীন অচলাবস্থা
দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের সবচেয়ে জমজমাট আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (BPL) নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তাই সত্যি হলো। বোর্ড পরিচালক ও ক্রিকেটারদের মধ্যকার চরম সংঘাতের জেরে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে বিপিএলের চলতি আসর। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় বিসিবি পরিচালক ও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের (Governing Council) সদস্য সচিব ইফতেখার রহমান মিঠু গণমাধ্যমকে এই খবর নিশ্চিত করেছেন। সিলেট পর্ব সফলভাবে শেষ হওয়ার পর আজ থেকেই ঢাকা পর্বের ম্যাচগুলো শুরু হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু অনাকাঙ্ক্ষিত এই ঘটনায় থমকে গেছে পুরো টুর্নামেন্ট।
বিতর্কের মূলে বিসিবি পরিচালকের বিস্ফোরক মন্তব্য
এই সংকটের সূত্রপাত মূলত বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলামের একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি বিশ্বকাপ ইস্যুতে ক্রিকেটারদের ‘Compensation’ বা ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্স নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। নাজমুল ইসলাম বলেছিলেন, ক্রিকেটারদের পেছনে বোর্ডের বিপুল অর্থ খরচ হলেও তারা আজ পর্যন্ত কোনো ‘Global Title’ বা বৈশ্বিক শিরোপা এনে দিতে পারেনি। এমনকি ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সের ব্যর্থতার দায়ভার হিসেবে উলটো তাদের কাছ থেকে খরচ ফেরত নেওয়ারও ইঙ্গিত দেন তিনি। একজন অভিভাবকসুলভ অবস্থান থেকে এমন ‘অপমানজনক’ মন্তব্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ক্রিকেটারদের মাঝে।
কোয়াব-এর আল্টিমেটাম ও ক্রিকেটারদের ধর্মঘট
নাজমুল ইসলামের এই মন্তব্যের প্রতিবাদে দ্রুতই ঐক্যবদ্ধ হয় ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (COAB)। ক্রিকেটারদের পক্ষ থেকে পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া হয়, ওই পরিচালকের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তারা মাঠে নামবেন না। এই ‘Ultimatum’-এর জেরে বৃহস্পতিবারের প্রথম ম্যাচটি পরিত্যক্ত হয়। এরপর মাঠের বদলে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন ক্রিকেটাররা। সেখানে কোয়াব সভাপতি মোহাম্মদ মিঠুন জানান, বিসিবি তাদের কাছে ৪৮ ঘণ্টা সময় চাইলেও তারা নাজমুল ইসলামের পদত্যাগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ‘Commitment’ বা গ্যারান্টি চান। বিসিবির পক্ষ থেকে তাকে অর্থ কমিটিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দিলেও ক্রিকেটাররা তাঁর পূর্ণ পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকেন।
আইনি জটিলতা ও বিসিবির অসহায়ত্ব
বিসিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নাজমুল ইসলাম যেহেতু নির্বাচিত পরিচালক, তাই তাকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করানো আইনিভাবে জটিল। তবে ক্রিকেটারদের ‘Boycott’-এর মুখে বিসিবি কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়ে। মিরপুর স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ম্যাচটি হওয়ার কথা থাকলেও সিলেট টাইটান্স ও রাজশাহী ওয়ারিয়র্স মাঠে নামেনি। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে রাতে ‘Franchise Owners’ বা ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের সঙ্গে বৈঠকের কথা থাকলেও তার আগেই টুর্নামেন্ট স্থগিতের ঘোষণা আসে।
অনিশ্চয়তার মুখে বিপিএল ও দেশের ক্রিকেট
বিপিএল স্থগিত হওয়ায় ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একইসঙ্গে টুর্নামেন্টের ‘Brand Value’ এবং আন্তর্জাতিক সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিসিবির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং ক্রিকেটারদের এই কঠোর অবস্থান দেশের ক্রিকেটের ভাবমূর্তিকে বিশ্বমঞ্চে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, বিসিবি এই ‘Crisis Management’-এ সফল হয় নাকি বিপিএলের এই আসরটি ইতিহাসের পাতায় একটি অসমাপ্ত অধ্যায় হিসেবে থেকে যায়।