• প্রযুক্তি
  • বালুকণার চেয়েও ছোট বিশ্বের ক্ষুদ্রতম রোবট: নিজেই সারিয়ে তুলবে নিজের ক্ষত, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লবের সংকেত

বালুকণার চেয়েও ছোট বিশ্বের ক্ষুদ্রতম রোবট: নিজেই সারিয়ে তুলবে নিজের ক্ষত, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লবের সংকেত

প্রযুক্তি ১ মিনিট পড়া
বালুকণার চেয়েও ছোট বিশ্বের ক্ষুদ্রতম রোবট: নিজেই সারিয়ে তুলবে নিজের ক্ষত, চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লবের সংকেত

অণুজীবের সমান আকৃতির এই রোবট মানবদেহের রক্তপ্রবাহে প্রবেশ করে রোগ শনাক্ত ও নিরাময়ে সক্ষম; ইউপেন ও মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের অভাবনীয় উদ্ভাবন।

তথ্যপ্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগে কল্পবিজ্ঞানকেও হার মানাল আধুনিক বিজ্ঞান। এবার বালুকণার চেয়েও ক্ষুদ্র এক রোবট উদ্ভাবন করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা কেবল স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলাচলেই সক্ষম নয়, বরং নিজের কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা ক্ষত তৈরি হলে তা নিজেই নিরাময় করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া (UPenn) এবং ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের গবেষকদের যৌথ প্রচেষ্টায় তৈরি এই ‘মাইক্রো-রোবট’ চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ন্যানো-প্রযুক্তির (Nanotechnology) ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আকার ও গঠন: খালি চোখে প্রায় অদৃশ্য

বিস্ময়কর এই রোবটগুলোর পরিমাপ মাত্র ০.২ x ০.৩ x ০.০৫ মিলিমিটার। সহজভাবে বলতে গেলে, এটি একটি বালুকণার চেয়েও ছোট এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে খালি চোখে একে দেখা প্রায় অসম্ভব। অণুজীবের সমান আকৃতির এই রোবটগুলো প্রোগ্রামযোগ্য (Programmable), অর্থাৎ এদের নির্দিষ্ট কাজের জন্য আগে থেকেই কমান্ড দিয়ে রাখা সম্ভব।

নিজস্ব ‘মস্তিষ্ক’ ও অবিশ্বাস্য বিদ্যুৎ সাশ্রয়

এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রোবটের প্রাণকেন্দ্র বা ‘মস্তিষ্ক’ হিসেবে কাজ করে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবে তৈরি একটি বিশেষ মাইক্রো-কম্পিউটার। অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই কম্পিউটারটি সচল রাখতে প্রয়োজন হয় মাত্র ৭৫ ন্যানোওয়াট (Nanowatt) বিদ্যুৎ। এটি বর্তমান সময়ের একটি স্মার্ট ওয়াচের তুলনায় প্রায় এক লাখ গুণ কম শক্তি খরচ করে। এই সামান্য শক্তি সঞ্চয়ের জন্য রোবটটির শরীরের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে বসানো হয়েছে সূক্ষ্ম সোলার প্যানেল (Solar Panel), যা আলো থেকে শক্তি সংগ্রহ করে।

সেলফ-হিলিং বা স্বয়ংক্রিয় নিরাময় ক্ষমতা

এই উদ্ভাবনের সবচেয়ে চমকপ্রদ বৈশিষ্ট্য হলো এর ‘সেলফ-হিলিং’ (Self-healing) ক্ষমতা। গবেষকরা জানিয়েছেন, পরিবেশগত কোনো প্রতিকূলতায় রোবটটির শরীরে কোনো ক্ষত বা যান্ত্রিক বিচ্যুতি দেখা দিলে এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রাথমিক স্তরের সংকেত ব্যবহার করে নিজেই তা সারিয়ে তুলতে পারে। এছাড়া প্রতিটি রোবটের একটি নির্দিষ্ট আইডেন্টিফিকেশন নম্বর রয়েছে, যার ফলে হাজারো রোবটের ভিড়েও নির্দিষ্ট একটিকে আলাদাভাবে শনাক্ত করে নির্দেশনা (Data Instruction) দেওয়া সম্ভব।

পানির নিচে ‘মাছের ঝাঁকের’ মতো চলাচল

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মার্ক মিসকিন জানান, এই রোবটগুলোতে প্রথাগত কোনো যান্ত্রিক হাত-পা বা গিয়ার নেই। পানির সান্দ্রতার কারণে অতি ক্ষুদ্র পর্যায়ে নড়াচড়া করা কঠিন হওয়ায় বিজ্ঞানীরা এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করেছেন। রোবটগুলো একটি বিশেষ বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে আশপাশের পানির অণুকে ঠেলে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। দলবদ্ধভাবে কাজ করার সময় এদের চলাচল অনেকটা সমুদ্রের মাছের ঝাঁকের মতো সুশৃঙ্খল মনে হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত

গবেষকদের মতে, এই উদ্ভাবন সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনবে হেলথকেয়ার (Healthcare) সেক্টরে। প্রতিটি রোবট তৈরির খরচ পড়বে মাত্র এক পয়সার মতো। ফলে হাজার হাজার রোবটকে একসাথে মানবদেহের রক্তপ্রবাহে (Bloodstream) ছেড়ে দেওয়া সম্ভব হবে। এগুলো শরীরের ভেতরে কোষ পর্যায়ের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা, ক্যানসার কোষ শনাক্ত করা কিংবা সুনির্দিষ্টভাবে শরীরের আক্রান্ত স্থানে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার (Targeted Drug Delivery) মতো জটিল কাজগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে করতে পারবে।

বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স রোবটিক্স’-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানী মহলে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। যদি বাণিজ্যিকভাবে এই রোবটের ব্যবহার শুরু হয়, তবে ভবিষ্যতে অস্ত্রোপচার ছাড়াই শরীরের অভ্যন্তরীণ জটিল রোগের চিকিৎসা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

Tags: micro robot nanotechnology health tech autonomous robot self healing upenn research science innovation medical robotics