চলতি মৌসুমের হাড়কাঁপানো শীতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দক্ষিণাঞ্চলের জনজীবন। তীব্র শৈত্যপ্রবাহে যেখানে মানুষের টিকে থাকাই দায়, সেখানে রাস্তার ধারের অবলা প্রাণীকুলের দুর্ভোগ অবর্ণনীয়। বিশেষ করে পটুয়াখালীর পৌর শহরের অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো বেওয়ারিশ কুকুরগুলো চরম খাদ্যসংকট ও আশ্রয়ের অভাবে ধুঁকছিল। এই অসহায় প্রাণীদের পাশে দাঁড়িয়ে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অ্যানিমেল লাভারস অফ পটুয়াখালী’ (Animal Lovers of Patuakhali)।
উষ্ণতার খোঁজে এক ব্যতিক্রমী ‘সোশ্যাল ইনিশিয়েটিভ’
বৃহস্পতিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পটুয়াখালী পৌরশহরের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এক বিশেষ অভিযানে নামেন সংগঠনের একঝাঁক তরুণ। তাদের লক্ষ্য ছিল কনকনে শীতে জবুথবু হয়ে থাকা কুকুরগুলোকে একটু উষ্ণতা দেওয়া। পাটের বস্তার ভেতরে খড়কুটো ভরে তারা তৈরি করেছেন বিশেষ ‘ওয়ার্ম বেড’ বা আরামদায়ক বিছানা। এরপর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে এই বিছানাগুলো স্থাপন করা হয়।
সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, পটুয়াখালী পৌর এলাকার বিভিন্ন সড়কে প্রায় ১৫০টি পাটের বস্তার বিছানা স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অন্তত শতাধিক কুকুর সরাসরি শীতের প্রকোপ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অনেক স্থানেই দেখা গেছে, বিছানাগুলো পাতার সাথে সাথেই সেখানে আশ্রয় নিয়েছে শীতে কাতর কুকুর ও তাদের ছানাগুলো।
জীবন বাঁচাতে এক মানবিক লড়াই
প্রাণী কল্যাণে নেওয়া এই উদ্যোগের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ‘অ্যানিমেল লাভারস অফ পটুয়াখালী’-এর পরিচালক আবদুল কাইউম জানান, “অতিরিক্ত শীতের কারণে রাস্তার অনেক কুকুর অসুস্থ হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, গত কয়েক দিনে শীত সইতে না পেরে বেশ কিছু কুকুরের বাচ্চা মারা গেছে। অবলা এই প্রাণীদের তো আর আর্তনাদ করার ভাষা নেই। তাই তাদের এই চরম কষ্টের সময়ে সামান্য উষ্ণতা দেওয়ার লক্ষ্যেই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা।” তিনি একে একটি মানবিক দায়বদ্ধতা হিসেবে দেখছেন।
প্রশাসনের সমর্থন ও লজিস্টিক সহায়তা
ব্যতিক্রমী এই কার্যক্রমে পূর্ণ সমর্থন জুগিয়েছেন পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক (DC) ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরী। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উৎসাহ প্রদান করায় সংগঠনের কাজ আরও সহজ হয়েছে। শুধু তাই নয়, পটুয়াখালী পৌরসভাও এই উদ্যোগে লজিস্টিক সাপোর্ট (Logistics Support) দিয়ে এগিয়ে এসেছে।
পটুয়াখালী পৌর প্রশাসক মো. জুয়েল রানা এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, “এটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় একটি কাজ। কুকুরদের জন্য বস্তা বিতরণের কাজে পৌরসভার গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া আমাদের পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন কেউ এই বিছানাগুলো সরিয়ে না ফেলে বা নষ্ট না করে। যেকোনো ভালো কাজে আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা সবসময় থাকবে।”
পশু কল্যাণে বাড়ছে সচেতনতা
শহরজুড়ে এই ‘এনিমেল রেসকিউ’ (Animal Rescue) কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মনেও ব্যাপক কৌতূহল ও সহমর্মিতার সৃষ্টি করেছে। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় যে রাস্তার প্রাণীদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে, তা এই উদ্যোগের মাধ্যমে আবারও সামনে এসেছে। শীতের রাতে যখন মানুষ নিজের ঘরের উষ্ণতায় বিশ্রাম নিচ্ছে, তখন একদল তরুণের এই ত্যাগ ও মানবিকতা পটুয়াখালীর রাজপথে এক অন্যরকম উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছে।