যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে অভিবাসন পুলিশের (ICE) গুলিতে পর পর দুই ব্যক্তি হতাহত হওয়ার ঘটনায় ছড়িয়ে পড়া গণবিক্ষোভ দমনে কঠোরতম পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিনি বিতর্কিত ‘Insurrection Act’ বা বিদ্রোহ দমন আইন ব্যবহার করে সেনাবাহিনী মোতায়েনের হুমকি দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে ট্রাম্প মিনেসোটার ডেমোক্র্যাট নেতাদের ‘দুর্নীতিবাজ’ আখ্যা দিয়ে এই চরম বার্তা দেন।
প্রেসিডেন্টের হুঁশিয়ারি ও সামরিক হস্তক্ষেপের প্রেক্ষাপট
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিনেসোটায় চলমান অস্থিরতা নিয়ে ট্রাম্প তার কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “যদি মিনেসোটার দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদরা আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হন এবং আন্দোলনকারী ও বিদ্রোহীদের হাত থেকে আইসিই-র (ICE) দেশপ্রেমিক সদস্যদের রক্ষা করতে না পারেন, তবে আমি ‘Insurrection Act’ চালু করতে দ্বিধা করব না। আমার আগে অনেক প্রেসিডেন্ট এটি করেছেন এবং আমি এই প্রহসনের দ্রুত অবসান ঘটাব।”
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘Mass Deportation’ বা গণ-নির্বাসন কর্মসূচি বাস্তবায়নে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই অভিযানের সামনের সারিতে রয়েছে ‘Immigration and Customs Enforcement’ (ICE), যাদের কার্যকলাপে এখন উত্তাল মিনেসোটা।
ভুল নিশানায় প্রাণহানি: মার্কিন নাগরিককে ‘অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী’ তকমা
মিনেসোটায় উত্তেজনার সূত্রপাত হয় গত বুধবার (৭ জানুয়ারি), যখন ছদ্মবেশী ও মাস্ক পরা আইসিই সদস্যরা মিনেয়োপলিস শহরে টহল দেওয়ার সময় এক মার্কিন নারীকে তার গাড়ির ভেতরেই গুলি করে হত্যা করে। নিহত ৩৭ বছর বয়সী রেনি নিকোল ম্যাকলিন গুড কোনো অভিবাসী ছিলেন না; তিনি কলোরাডো অঙ্গরাজ্যে জন্ম নেওয়া তিন সন্তানের জননী এবং একজন গর্বিত মার্কিন নাগরিক।
দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, আইসিই সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ডের পর রেনিকে ‘Internal Terrorist’ বা অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করে। প্রশাসনের এই অমানবিক ও মিথ্যা প্রচারণার খবর ছড়িয়ে পড়তেই মিনেসোটা ছাড়িয়ে পুরো আমেরিকাজুড়ে বিক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। বিক্ষোভকারীরা আইসিই এজেন্টদের শহর থেকে অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার দাবি তুলেছেন।
বিক্ষোভের মাঝে দ্বিতীয় দফার সহিংসতা
রেনির মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই গত বুধবার (১৪ জানুয়ারি) রাতে মিনিয়াপলিসে আরও এক অভিবাসীকে গুলি করে আইসিই এজেন্টরা। বর্তমানে গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আইসিই-র দাবি, ওই ব্যক্তি ভেনেজুয়েলার নাগরিক এবং তিনি অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছিলেন। আইসিই এজেন্ট তাকে আটকের চেষ্টা করলে তিনি বেলচা দিয়ে আক্রমণ করেছিলেন বলে দাবি করা হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে এই দ্বিতীয় গুলির ঘটনা বিক্ষোভকারীদের আরও ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
রণক্ষেত্র মিনেসোটা: টিয়ারগ্যাস ও ড্রাগ-নেট অপারেশন
বৃহস্পতিবার বিক্ষোভকারীরা দ্বিতীয় ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থানে জড়ো হয়ে মুহুর্মুহু স্লোগান দিলে নিরাপত্তা বাহিনী নজিরবিহীন শক্তি প্রয়োগ করে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে ‘Flash-bang Grenade’ এবং টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, আইসিই সদস্যরা অনেকটা ‘Military Style’ বা সামরিক কায়দায় শহর চষে বেড়াচ্ছে। এমনকি সন্দেহভাজনদের গাড়ি থেকে জানালা ভেঙে টেনে বের করে পরিচয়পত্র তল্লাশি করা হচ্ছে, যা মূলত কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিন মার্কিন নাগরিকদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলছে।
আইনি লড়াই ও অনিশ্চয়তা
মিনিয়াপোলিস কর্তৃপক্ষ ইতিমধেই রেনি নিকোল গুড হত্যার ঘটনায় একটি ‘Independent Investigation’ বা নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অনড় অবস্থান এবং সেনাবাহিনীকে নামানোর প্রচ্ছন্ন হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মিনেসোটার এই সংঘাত ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎ এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।