মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণের উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বারবার দেওয়া ‘দখল’ হুমকির মুখে এবার নড়েচড়ে বসেছে ইউরোপীয় শক্তিগুলো। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দ্বীপটির সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে গ্রিনল্যান্ডে সেনা পাঠাতে শুরু করেছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। ডেনমার্ক এবং তার ইউরোপীয় মিত্রদের এই পদক্ষেপ বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক (Geopolitical) উত্তাপের জন্ম দিয়েছে।
আর্কটিকের বরফে ইউরোপীয় সামরিক বুট
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) ফ্রান্স ও জার্মানির অন্তত ২৮ জন সেনার একটি অগ্রবর্তী দল গ্রিনল্যান্ডে পৌঁছেছে। শুধু এই দুই দেশই নয়, দ্বীপটির নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী করতে এই অভিযানে যোগ দিচ্ছে যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডসের সামরিক বাহিনীও। মূলত একটি ‘Joint Exercise’ বা যৌথ মহড়ার নাম দিয়ে এই সেনা মোতায়েন শুরু হলেও এর নেপথ্যে কাজ করছে ট্রাম্পের সম্ভাব্য আগ্রাসন ঠেকানোর প্রচ্ছন্ন সংকেত।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প যে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তাকে আশ্বস্ত করতে চায় যে—ইউরোপ নিজেই তার ভূখণ্ড রক্ষায় সক্ষম।
ন্যাটোর স্বার্থ ও ডেনমার্কের দৃঢ়তা
গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে ডেনমার্ক, গ্রিনল্যান্ড প্রশাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ড্যানিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিকসেন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ডের সুরক্ষা শুধু ডেনমার্কের বিষয় নয়, এটি পুরো ন্যাটো (NATO) জোটের জন্য একটি কৌশলগত অগ্রাধিকার।
ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং রাশিয়ার সামরিক হুমকির কথা স্বীকার করলেও দাবি করেছেন, ডেনমার্ক একাই গ্রিনল্যান্ডের পরিস্থিতি সামাল দিতে সক্ষম এবং এর জন্য কোনো তৃতীয় দেশের ‘অধিগ্রহণ’ বা হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই।
হোয়াইট হাউসের হুঁশিয়ারি: সিদ্ধান্তে অনড় ট্রাম্প
ইউরোপীয় সেনাদের এই মোতায়েন ট্রাম্প প্রশাসনের মনোভাবে কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। বরং হোয়াইট হাউস থেকে আরও কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো গ্রিনল্যান্ডে কত সেনা মোতায়েন করল, তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
লেভিট আরও ইঙ্গিত দেন যে, গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণের লক্ষে ট্রাম্প প্রশাসন প্রয়োজনে ‘বল প্রয়োগ’ (Use of Force) করার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দিচ্ছে না। ওয়াশিংটনের এমন অনড় অবস্থান আটলান্টিকের দুই পাড়ের মিত্রদের মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
রাশিয়া ও চীনের প্রতিক্রিয়া
এদিকে গ্রিনল্যান্ডকে কেন্দ্র করে পশ্চিমা দেশগুলোর রাশিয়ার দিকে আঙুল তোলাকে হাস্যকর বলে আখ্যা দিয়েছে মস্কো। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা এক বিবৃতিতে বলেন, “মস্কো বা বেইজিং কখনোই গ্রিনল্যান্ড দখলের কোনো পরিকল্পনা করেনি। পশ্চিমাদের এই ভিত্তিহীন ভীতি প্রদর্শনের মানসিকতা গ্রহণযোগ্য নয়।” তিনি দাবি করেন, গ্রিনল্যান্ডকে ইস্যু করে পশ্চিমা দেশগুলো আসলে আর্কটিক অঞ্চলে তাদের নিজেদের সামরিক সক্ষমতা (Military Presence) বাড়ানোর অজুহাত খুঁজছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রিনল্যান্ড কেবল একটি বরফে ঢাকা দ্বীপ নয়, বরং এটি এখন ওয়াশিংটন, কোপেনহেগেন এবং ব্রাসেলসের মধ্যে এক বিশাল শক্তির লড়াইয়ের (Power Struggle) কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের ‘America First’ নীতি এবং ইউরোপের সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াই শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।